kalerkantho


খুঁজে পাওয়া ছবিগুলো

ক্যামেরাম্যান মুক্তিযোদ্ধা

এক হাতে তিনি অস্ত্র নিতেন, অন্য হাতে ক্যামেরা। তিনি এস এম সফি। তাঁর ছাপা না হওয়া ছবি খুঁজে পেয়েছেন ফখরে আলম

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ক্যামেরাম্যান মুক্তিযোদ্ধা

একাত্তরের ডিসেম্বরে যশোর সার্কিট হাউসে মিত্রবাহিনীর অধিনায়ক মেজর দলবীর সিংয়ের সঙ্গে সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন ও অন্য নেতারা

এস এম সফি ছিলেন পাগল কিসিমের লোক। ক্যামেরা, ফটোগ্রাফি—এসব বিষয়ে উন্মাদ ছিলেন তিনি। পাগল ছিলেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও। বাকিতে পেপার কিনে ছবি বানিয়ে দিতেন। যার যত মুক্তিযুদ্ধের ছবির প্রয়োজন  এক ঘণ্টার নোটিশে সরবরাহ করতেন। এ পাগলামির ভেতরই এস এম সফি জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছিলেন।

তাঁর মধ্যে এই উন্মাদনা শুরু হয়েছিল ঊনসত্তরের গণ-অভুত্থানের পরপরই। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বিষয়টি আরো চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তিনি রণাঙ্গনে ছুটে যান। এক হাতে রাইফেল, অন্য হাতে ক্যামেরা নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। হানাদার বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের ছবি ক্যামেরাবন্দি করেন।

অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস, সংগ্রামও ধরে রাখেন।

পাশাপাশি যুদ্ধদিনের সেই সব ছবি রণাঙ্গন থেকে পাঠাতে থাকেন ভারত, ব্রিটেন, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের মিডিয়ায়। অনেক ছবি ছাপাও হয়েছিল। ফলে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে ওঠে বহির্বিশ্বে। খালে-বিলে, বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েও তিনি মুক্তিযুদ্ধের সচিত্র ইতিহাস সংরক্ষণ করেছিলেন।

যুদ্ধ শেষে অনেক ছবি এস এম সফি ঘনিষ্ঠজনদের দিয়েছেন। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসের সংকলনে সেই ছবি মুদ্রিত হয়েছে। ছবি দেখে দেখে  তিনি ফিরে যেতেন একাত্তরের দিনগুলোতে। এটিও ছিল তাঁর আরেক সংগ্রাম। মানুষ যেন সেই মহান আত্মত্যাগ ভুলে না যায়—তাঁর জন্য যুদ্ধের পরও যুদ্ধ করেছেন। তিনি গেছেন অনেকজনের কাছে। বলেছেন, একটি মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রহশালা বা জাদুঘর নির্মাণ করতে চাই। নতুন প্রজন্মকে একাত্তরের কথা পৌঁছে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারেননি। ১৯৯৭ সালের ১০ আগস্ট ৬৩ বছর বয়সে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান।

এস এম সফি যশোরের সূর্যসন্তান। শত্রুমুক্ত প্রথম জেলা যশোর। দিনটি ছিল ১১ ডিসেম্বর। সেই দিনটিকেও  তিনি ক্যামেরাবন্দি করেছেন। ওই দিন  যশোর টাউন হল মাঠে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম জনসভার ছবি তুলেছেন। যুদ্ধ শুরুর আগে ৩ মার্চ  টিঅ্যান্ডটি অফিসের সামনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে প্রথম শহীদ চারুবালা করের মৃতদেহ নিয়ে মুক্তিকামী মানুষ মিছিল করে। ওই দিনের ছবিও তুলেছেন তিনি। তারপর ৪ এপ্রিল, আরিফপুর এলাকায় ট্রেনের ভেতর দিয়ে ক্রলিং করে, বুলেটবৃষ্টির মধ্যে, হানাদারদের গুলিতে নিহত নিরীহ বাঙালির ছবি তুলেছেন। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য ছবি নিজের জীবন বাজি রেখে তুলে নিজেও ইতিহাস হয়েছেন।

এস এম সফি ১৯৩৪ সালের ১০ আগস্ট যশোর শহরের চুড়িপট্টি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে ভারতের দার্জিলিংয়ে। জলপাইগুড়ি শহরের একটি স্টুডিওতে চাকরি করার সুবাদে ছবি তোলায়  হাতেখড়ি। কিশোর বয়সে দার্জিলিংয়ের চা বাগানের ছবি তুলেছেন। এরপর ১৯৬২ সালের দিকে যশোরে আসেন।

১৯৬৩ সালে শহরের রেল রোডে ‘ফটো ফোকাস’ নামে তিনি একটি স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন। মুক্তিযুদ্ধের ৪০০টি ছবি তিনি তুলেছেন। যার মধ্যে বেশির ভাগ ছবি নষ্ট হয়ে গেছে। ঢাকা ও যশোরে এস এম সফির আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৭৪, ১৯৭৯, ১৯৮০, ১৯৮৭, ১৯৯১, ১৯৯২ সালে। ১৯৯৩ সালে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছবি নিয়ে তিনি একটি বর্ষপঞ্জি প্রকাশ করেন। ১৯৯৪ সালে ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে তাঁর শেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়। হেলপ দ্য ডিসট্রেস্ড তাঁর ছবি নিয়ে ২০০৬ সালে ‘আলোকচিত্রে একাত্তর’ নামের একটি অ্যালবাম প্রকাশ করে। এই অ্যালবামে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ৬৩টি ছবি রয়েছে।


মন্তব্য