kalerkantho


পাকিস্তানের চিঠি

‘আমরা ভুল করেছি’

একাত্তরে সংঘটিত গণহত্যা ও যুদ্ধকে কি চোখে দেখে পাকিস্তানের বর্তমান তরুণ প্রজন্ম, তার একটি নমুনা পাকিস্তানের তরুণ চিত্রশিল্পী, ব্লগার, লেখক ও আলোকচিত্রী জামাল আশিকাইনের এই ব্লগ ও তার প্রতিক্রিয়া

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘আমরা ভুল করেছি’

জামাল আশিকাইন

১৯৭১ সালের ইতিহাস রচিত হয়েছে আমার জন্মের অনেক বছর আগে। আশির দশকের মাঝামাঝি আমি তখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। একদিন শুনি, এক সহপাঠী খানিকটা চাপা গায়ের রঙের এক ছাত্রকে বলছে, ‘ভুখে বাঙালি!’ বাসায় ফিরে মায়ের কাছে জানতে চাইলাম, কেন বাঙালিদের ভুখা বলা হয়? কেন বাঙালি কথাটি গালি হিসেবে ব্যবহার করা হয়? এভাবেই প্রথম জানলাম, আমরা কিভাবে বাঙালিদের শাসন করেছি, নিজেদের স্বার্থে তাদের ব্যবহার করেছি, কঠোর পরিশ্রমে বাধ্য করেছি। আর বিনিময়ে মজুরি দিয়েছি, যা প্রাপ্য তার অর্ধেকেরও কম। কিন্তু মর্যাদার বেলায় আমরা তাদের দিইনি কিছুই।

ওই দিনই আমার প্রথম উপলব্ধি হয়, বাঙালিদের প্রতি আমরা কতটা অমানবিক ছিলাম। তারপর যত সময় গেছে, ১৯৭১ সালের পুরনো ইতিহাস, গল্প ও ঘটনা প্রবাহ আমার কাছে উন্মোচিত হয়েছে। একাত্তরের ছবিগুলো একে একে বীভৎস থেকে বীভৎসতর হয়ে আমার মনঃপীড়ার কারণ হয়েছে। দুঃসহ এক ইতিহাস আমায় তাড়িয়ে বেড়াতে থাকে। বাঙালি ভাই ও বোনদের প্রতি আমরা যেসব পাশবিক ও নৃশংস আচরণ করেছি, তার এক অনস্বীকার্য ছবি ভেসে উঠতে থাকে আমার সামনে।

গতকাল (১১ মে, ২০০৮) করাচির  টি-টু-এফ ক্যাফেতে সাহিত্য সন্ধ্যায় যে বই থেকে পাঠ হলো, সেটি ১৯৭১ সাল নিয়ে লেখা গল্পের সংকলন। সংকলনটি সম্পাদনা করেছেন বাংলাদেশের নিয়াজ জামান ও পাকিস্তানের আসিফ ফারুকি। এতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের খ্যাতিমান কয়েকজন লেখকের গল্প আছে। ক্যাফের আড্ডায় বিশিষ্ট নিয়াজ জামান ও আসিফ ফারুকি ছাড়াও লেখক ইনতিজার হুসাইন, আসাদ মোহাম্মদ খান ও ডন পত্রিকার সাহিত্য পাতার সম্পাদক সাইমা হোসাইন উপস্থিত ছিলেন। লেখকরা এসেছিলেন তাঁদের গল্প, দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনা উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে।

আসাদ মোহাম্মদ খানের লেখা গল্প ‘ফর্কলিফট নাম্বার ৩৫২’-র উর্দু সংস্করণ পাঠ দিয়ে শুরু হয়েছিল পাঠ সন্ধ্যা। তারপর আসিফ ফারুকি প্রশ্ন করেন, ‘গল্পে এই যে আমরা ফল্টি ফর্কলিফট—অর্থাৎ ত্রুটিপূর্ণ মালটানা ট্রাকের কথা বললাম, তার কোনো যোগ্য চালক কি আদৌ আমাদের আছে?’ তখন আমার মনে হলো, সময় যে ভুল ইতিহাস রচনা করেছে তার জন্য আমরা ত্রুটিপূর্ণ যান বা এর চালককে দোষী করতে পারি। কিন্তু তারা যে ক্ষতি করেছে তা থেকে আমরা কিছু কি শিক্ষা নিয়েছি, নাকি নিইনি?

সাহিত্য সন্ধ্যা রাতে গড়ায়। ইনতিজার হোসাইন বিষয়টি নিয়ে তাঁর ভাবনা তুলে ধরেন। আসিফ ফারুকি বইয়ে স্থান পাওয়া তাঁর রচনা থেকে পড়ে শোনান। সম্পাদক নিয়াজ জামানও নিজের পার করা সেই দিনগুলোর কথা বলেন এবং অবিচার ও অন্যায়ের ব্যাপারে ক্ষোভ ব্যক্ত করেন।

পুরনো ছবিটির দিকে যখন তাকাই, বিশেষ করে নিজের অবস্থানের বিষয়ে সচেতন হয়ে যখন দেখি, বুঝতে অসুবিধা হয় না আমরা বাংলাদেশের মানুষকে এমন এক স্থানে ঠেলে দিয়েছিলাম যে তারা একদম কোণঠাসা হয়ে পড়ে। আর একবার দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে করণীয় কি খুব বেশি থাকে?

তিন দিন হলো ইন্টারনেটে একটি ওয়েবসাইট পেয়েছি। একটি ঘটনায় কিছু নারীর ওপর নারকীয়ভাবে যু্্দ্ধাপরাধ সংঘটিত করা হয়েছে। আর এই নারীরা সেই জনগোষ্ঠীর, যাদের আমরা ইচ্ছা করে দরিদ্র বানিয়ে রেখেছি, অসহায় করে তুলেছি, ঘটনার শিকার বানিয়েছি। এই লজ্জার ইতিহাস যতই জানছি, কোনো বাঙালির চোখে চোখ রাখতে পারছি না। আমি জানি, ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো অপরাধ করিনি। এর পরও নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না। এসব অপরাধের জন্য, ঘটনাপ্রবাহের জন্য আমি আর্মিকে দুষছি না, কোনো বিদেশি পক্ষকেও দায়ী করছি না। আমি কাউকেই অভিযুক্ত করছি না, নিজেকে ছাড়া। আমি ও আমার মতো কিছু মানুষই তো সুবিধা নিয়েছি, কখনো বাঙালিদের প্রতি অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াইনি, অন্যায়ের কোনো প্রতিবাদ করিনি। আমরা এমনকি আমাদের সন্তানদেরও ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত করেছি। কিছু কথা বলা উচিত ছিল, আমরা বলিনি, এ-ও কি দায়িত্বহীনতা নয়?

আমরা অতীতে ভুল করেছি। তবে সে ভুল শোধরানোর সময় পেরিয়ে যায়নি। আপাতত আমাদের এই উপলব্ধি হোক যে আমরা ভুল করেছি। দায় মেনে নিয়ে আমরা যেন প্রতিজ্ঞা করি এমন অপরাধ আর করব না। যেসব সত্য আমরা চেপে গেছি কিংবা কেটেছেঁটে মুছে ফেলেছি, যে ইতিহাস আজও আমাদের অজানা রয়ে গেছে, সব সামনে নিয়ে আসার সময় এসেছে। এ কাজে আমাদের সহায় হতে পারে ‘ফল্ট লাইন’ গ্রন্থটি। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস প্রকাশিত বইটি পাকিস্তানেও পাওয়া যাচ্ছে। আশা করি, এ ধরনের অসাধারণ রচনা ও সংকলন আগামী দিনগুলোয়ও পাঠকরা পাবে। আমাদের ব্লগার, লেখক ও সাংবাদিকদের উচিত নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে ১৯৭১ সালের ইতিহাসকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। এখানে আমরা কেউ কাউকে হেয় করছি না। বরং আমরা আমাদের দেশবাসীকে ধরিয়ে দিতে চাই কোথায় আমরা জাতি হিসেবে ভুল করেছিলাম।

পুনশ্চ : আমার লেখার অনেকে প্রশংসা করছেন। কেউ কেউ পরামর্শও দিচ্ছেন। সেই মতো ফেসবুকে একটি গ্রুপ খোলা হয়েছে। এই গ্রুপে গিয়ে আমরা বাংলাদেশের মানুষের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারব। আমি নিজে গ্রুপে যুক্ত হয়েছি। আশা করি, আপনারা এতে যোগ দেবেন। আমরা যত বেশি সক্রিয় হব তত দ্রুত জনমনে বার্তাটি ছড়াবে এবং মানুষ উদ্বুদ্ধ হবে।

১৯৭১ সালটি পাকিস্তানের জন্য এক বেদনাদায়ক বছর ছিল, বর্তমান বাংলাদেশের জন্য তো বটেই। তা হলে চলুন এ থেকে শিক্ষা নিই এবং ইতিহাসে এ ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার শপথ গ্রহণ করি।

 

 

করাচি মেটসব্লগ থেকে লেখাটি বাংলা করেছেন গাউস রহমান পিয়াস

 

পোস্টটি পড়ার পর যেসব মন্তব্য হয়েছে তার মধ্য থেকে কয়েকটি দেওয়া হলো

 

সাজ্জাদ মকবুল (১৩ মে ২০০৮) : দারুণ পোস্ট। ১৯৭১—এর নৃশংসতা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। পেছনে তাকালে আমি লজ্জাবোধ করি এবং আমার নির্যাতিত বাঙালি ভাইবোনের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করছি।

 

আফরিন (১৩ মে ২০০৮) : দারুণ লিখেছেন। আমিও মনে করতে পারি, আমাদের স্কুলের ছেলেরা গালি দিত ‘বাঙালি কাহিকা’ বলে। ইহুদিদের ওপর সাদা মানুষরা যে রকম নির্যাতন করেছিল, একাত্তরের বর্বরতাও আমাকে সেদিনের কথাই মনে করিয়ে দেয়। রাজনীতিকরা সেদিন সাধারণ মানুষদের অন্ধ করে রেখেছিল। আমি আশা করি, সাধারণ মানুষ আর অন্ধকারে থাকবে না এবং বাঙালিদের সম্মান করবে।

 

দামান (১৩ মে ২০০৮) : ধন্যবাদ। আপনি আমাদের আলোকিত করলেন।


মন্তব্য