kalerkantho


খুঁজে পাওয়া ছবিগুলো

ছবিটা ফাদার রিগনের তোলা

১৯৭১ সালের মাঝামাঝিতে বর্তমান মুকসুদপুর উপজেলার বানিয়ারচর গ্রামের বানিয়ারচর ক্যাথলিক চার্চের মধ্যে পাঁচ মুক্তিযোদ্ধা। তাঁরা হেমায়েত বাহিনীর যোদ্ধা। এখন কে কোথায় আছেন, কী তাঁদের পরিচয়—জানা যায়নি। বাহিনীপ্রধান হেমায়েত উদ্দিনকে বীরবিক্রম সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। তিনি এখন কিছুটা অসুস্থ। ছবিটি খুঁজে পেয়েছেন কালের কণ্ঠের গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি প্রসূন মণ্ডল

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ছবিটা ফাদার রিগনের তোলা

হেমায়েত বাহিনীর দুটি যুদ্ধ

 

শেখবাড়ির যুদ্ধ :  হেমায়েত উদ্দিন জানতে পারেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পিতা ও মাতাকে পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের টুঙ্গিপাড়ার বাড়িতে বন্দি রেখেছে। খবর পেয়ে ১১ জুলাই ১৫০ জনের একটি শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে শেখবাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলে আক্রমণ শুরু করে হেমায়েত বাহিনী।

হেমায়েত বাহিনীর আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী সব কিছু ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরে হেমায়েত বাহিনী বঙ্গবন্ধুর পিতা ও মাতাকে মাদারীপুরের শিবচর থানার ইলিয়াস চৌধুরীর বাড়িতে পৌঁছে দেন। এ যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি কম হলেও বেশকিছু পাকিস্তানি অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আসে।

রামশীল : ১৪ জুলাই ১৯৭১। বাহিনীর ক্যাম্প ছিল বিলের মাঝে। পাকিস্তানি বাহিনীর তিনটি শক্তিশালী দল মাদারীপুর, টেকেরহাট হয়ে ক্যাম্পের দিকে এগোতে থাকে। খবর পেয়ে হেমায়েত উদ্দিন প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নেন এবং আশপাশের সব দলকে খবর দেন। হানাদার বাহিনী যেদিক থেকে আসছিল সেদিকে দল নিয়ে পজিশন নেন হেমায়েত উদ্দিন। ২৫-৩০ গজের মধ্যে এলে হেমায়েত মেশিনগান থেকে গুলি ছোড়েন।

শুরু হয় উভয়পক্ষের তুমুল গোলাগুলি। পাকিস্তানি বাহিনীর একটি গুলি হেমায়েত বাহিনীর নায়েক যোদ্ধা মকবুলের মাথার খুলি উড়িয়ে দেয়। তাঁর লাশ টানতে গিয়ে শত্রুর অন্য একটি গুলি হেমায়েতের মুখের চোয়াল ভেদ করে ১১টি দাঁত ও জিহ্বার এক টুকরো মাংস নিয়ে বেরিয়ে যায়। কাউকে কিছু না বলে মকবুলের হাতের মেশিনগানটি অন্যকে চালাতে দিয়ে এবং নিজে গামছা দিয়ে মুখ বেঁধে আবার যুদ্ধ শুরু করেন। এরই মধ্যে প্রায় এক হাজার মুক্তিযোদ্ধা আশপাশের ক্যাম্প থেকে এসে পাকিস্তানি বাহিনীকে ঘিরে ফেলে। প্রায় ৪৫ মিনিট গোলাগুলির পর পাকিস্তানি বাহিনীর ১৫৮ জন হতাহত হয়।

 

ফাদার মারিনো রিগন

১৯৫৩ সালে তিনি যখন বাংলাদেশে (তখনকার পূর্ব পাকিস্তান) আসেন, তখন তাঁর বয়স ২৮। তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, দেশটি সম্পর্কে আমি কিছু জানতাম না। ছোটবেলায় ভাবতাম, আফ্রিকা যাব। কিন্তু স্রষ্টার ইচ্ছা কিছু আলাদাই ছিল। ’ কুষ্টিয়ার একটি মিশনে তিনি প্রথম কাজে যোগ দেন। সেখানে তিনি বাংলা শেখেন। ‘আমি সব সময় কান খাড়া রাখতাম। আর বলতাম, দয়া করে আরেকবার কি বলবেন?’ একসময় তিনি বাংলায় এতই সড়গড় হয়ে ওঠেন যে শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পণ্ডিতমশাই উপন্যাসটিও পড়ে ফেলেন। পরবর্তীকালে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সব উপন্যাস পড়ে ফেলেন। ১৯৫৪ সালে রিগন চলে যান মোংলার সেন্ট পলস ক্যাথলিক চার্চে। সেখানে তিনি সেন্ট পলস হাই স্কুল গড়ে তোলায় মন দেন। তাঁর বাড়ি ইতালিতে। তিনি ইতালীয় ভাষায় গীতাঞ্জলি অনুবাদ করেছেন। জসীমউদ্দীনের নকশী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট, লালন সাঁইয়ের ৩৫০টি গানও অনুবাদ করেছেন। তিনি কবিতা পড়তে পছন্দ করেন। নিজেও লিখেন। তাঁর দুটি বাক্য এমন—

‘আমার গ্রাম থেকে যাত্রা আরম্ভ করেছি যাত্রি বেশে

সেই যাত্রার শেষ হয় যেন সোনার বাংলাদেশে। ’

একাত্তরে যুদ্ধ চলাকালে তিনি ছিলেন বানিয়ারচর মিশনে। বলেছেন, ২৫ মার্চ আমি কলকাতা রেডিও শুনছিলাম। হঠাৎ বেজে ওঠে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি...। আমার হৃদয়ে গানটি বসে যায়। রাতে ভালো ঘুম হয়নি। সকালে হিন্দু বাড়িগুলোতে গিয়ে ফাদার রিগন তাদের অভয় দিয়েছেন।

একাত্তরের যুদ্ধের একদিন। হেমায়েত বাহিনীর হেমায়েত উদ্দিন গুলিবিদ্ধ। চিকিৎসার জন্য দলের সদস্যরা তাঁকে নিয়ে আসে বানিয়ারচর মিশনে। ফাদার রিগন স্মৃতিকথায় বলেছেন, ‘তাঁর চোয়াল ঝুলে পড়েছিল, অনেক দাঁত পড়ে গিয়েছিল। সিস্টার ও ডাক্তাররা বললেন, বাঁচানো সম্ভব নয়। আমি বললাম, স্রষ্টার নাম নিয়ে শুরু করো। যতটা সম্ভব চিকিৎসা দাও। ’

২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ফাদার মারিনো রিগনকে স্বাধীনতাযুদ্ধে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়।

২০০৯ সালে ফাদার রিগন খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার জন্য যান ইতালিতে। সুস্থ হয়ে ফেরেন বাংলাদেশে। বলেন, আমার সারা জীবন পার হয়েছে এখানে, আমি আর কোথাও যাব না।


মন্তব্য