kalerkantho


সেই সময়

শীলা রায়ের ছবির যুদ্ধ

মায়ের কোলে মৃতপ্রায় অভুক্ত শিশু, নারী-পুরুষের লাশ ডোবা-নালায়, দেশত্যাগী ভুখানাঙা মানুষের দল—একাত্তরের বিভিন্ন দিনের ছবি। এমনই একটি ছবি জুলাই মাসে খামে ভরতে গিয়ে শীলা রায় অঝোরে কেঁদে ফেলেন—তাঁর মাতৃভূমির ছবি। তখন তাঁর বয়স ৩০। এখন ৭৫। দেখা করতে গিয়েছিলেন শামস শামীম

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শীলা রায়ের ছবির যুদ্ধ

ছবিটি রঘু রাইয়ের তোলা। এমন সব ছবি দেখেই কেঁদে উঠতেন শীলা রায়। মনে পড়ত মা-বাবার কথা, দেশের কথা

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তিযুদ্ধ সহায়ক সমিতির কর্মী ছিলেন শীলা। তাঁর কাজ ছিল মুক্তিযুদ্ধের বীভৎসতার ছবি খামে পুরে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে পাঠানো।

ছবির সঙ্গে স্থান-কালের বর্ণনা ও পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতার কথা লিখে বুকলেট ছাপানো হতো। আর সেগুলো ডাকে পাঠিয়ে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলতে সাহায্য করতেন শীলা রায়। ছবিগুলোর ক্যাপশন লিখতেন সমিতিতে কর্মরত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা। প্রায় দিনই এই ছবি-সংবলিত বুকলেট খামে পোরার সময় কেঁদে বুক ভাসাতেন শীলা রায়। এখন ৭৫ বছর বয়সী এই নারী যুদ্ধদিনের সেই ঘটনার ঝাপসা স্মৃতি বহন করছেন।

ঊনসত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি প্রগতিশীল রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে যান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের পর দেখলেন সাধারণ মানুষ যার যা আছে, তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এই টালমাটাল অবস্থায় উদ্বিগ্ন বাবা হীরেন্দ্র চন্দ্র মজুমদার ও মা মুকুল রানী মজুমদার প্রতিবেশীদের সঙ্গে শীলাকে নেত্রকোনা থেকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। বাবা ও কাকাসহ পরিবারের অন্যরা যুদ্ধের দিনগুলোতে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দিচ্ছিলেন।

ওই অপরাধে রাজাকাররা তাঁর বাবা ও কাকাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে।

কলকাতায় সেই খবর তখন পৌঁছায়নি। ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে যখন বাড়িতে ফিরছিলেন, তখন পথের মানুষের কাছে সে খবর পান। ফিরে এসে দেখেন বাড়ি একটি শ্মশানপুরী। সারা বাড়ি ছাইয়ের চাদর মুড়ি দিয়ে জবুথবু হয়ে আছে।

একাত্তরের জুলাই মাসে ২০০ টাকা বেতনে ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তিযুদ্ধ সহায়ক সমিতির কর্মী হিসেবে যোগ দেন শীলা রায়। এই সমিতির সেক্রেটারি ছিলেন অধ্যাপক দিলীপ চক্রবর্তী। শীলা কাজ করতেন মনোযোগ দিয়ে। বড়রা তাই খুব স্নেহ করতেন। সমিতির অফিসে নানা ধরনের কাজের পাশাপাশি তিনি বিভিএসসি (বাংলাদেশ ভলান্টারি সার্ভিস কোর)-এর সদস্য হিসেবে নিয়মিত শরণার্থী শিবিরে যেতেন। শরণার্থী শিবিরে গিয়ে তাঁর মন খারাপ হতো। সাহস দিতে দামাল মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কথা শোনাতেন আতঙ্কিত মানুষদের।

 সমিতির ওই বিশেষ প্রকল্পে আরো যুক্ত ছিলেন প্রফেসর সুনন্দা সরকার, প্রফেসর প্রিয়দর্শন শর্মা, নারায়ণগঞ্জের তরুণ রাজনীতিবিদ বাবু সরোয়ারসহ (কবরী সরোয়ারের স্বামী) আরো অনেকে। বয়স অনেক স্মৃতি কেড়ে নিয়েছে, ঝাপসা করে দিয়েছে প্রিয় মুখগুলোকেও। সমিতির অধীন একটি প্রকল্পের সমন্বয়ক ছিলেন ফোকলোরবিদ ড. মজহারুল ইসলাম।

ড. ইসলামের প্রকল্পের কর্মীদের কাজ ছিল শরণার্থী শিবিরকেন্দ্রিক। কর্মীরা শরণার্থীদের মানসিক সহায়তা দিতেন। তা ছাড়া  শরণার্থী মানুষদের সঙ্গে কথা বলে সংগ্রহ করতেন লোককাহিনী, প্রবাদ, প্রবচনসহ নানা তথ্য। এ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বাংলা একাডেমি কাজও করেছে।

সমিতির অফিসে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নিয়মিত কাজ করতেন শীলা রায়। জুলাই মাসের একদিন সমিতির সেক্রেটারি দিলীপ চক্রবর্তী শীলাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও গোপন কাজ দেন। সেটি ওই যে ভয়াবহতার ছবি খামে ভরে দেশে দেশে পাঠানো।   ছবিগুলো দেখতে দেখতে তাঁর বারবার মনে হতো, দেশে মা-বাবা ঠিক আছে তো?

শীলা রায় কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে অনুষ্ঠিত নানা সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কাজেও সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। শান্তিনিকেতন কর্তৃপক্ষ রবীন্দ্র সদনে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান তা সফল করতে দিনরাত খেটেছিলেন শীলা। তখন শীলা রায়, সুনন্দা সরকার ও বাবু সরোয়ারসহ সমিতির আরো অনেকে দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোতে অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রি করেছেন। সেই সঙ্গে বিদেশি বন্ধুদের অবগত করেছেন পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা, নারী ধর্ষণ, শিশু হত্যাসহ আরো ভয়াবহতার কথা। ওই অনুষ্ঠান থেকে পাওয়া সমুদয় টাকা মুক্তিযুদ্ধের সহায়তায় দান করে সমিতি। অনুষ্ঠানে সুচিত্রা মিত্রাসহ তখনকার নামিদামি শিল্পীরা গান গেয়েছিলেন। শিল্পীদের অনেকেই গান গাইতে গিয়ে আবেগে কেঁদে ফেলেছিলেন।

সমিতির বিজ্ঞান বিভাগের সমন্বয়ক ছিলেন প্রফেসর শামছুল আলম। তিনি হঠাৎ একদিন শীলাকে ডেকে পাঠান। জানান, বিপ্লবী অজিত রায়ের ওখানে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল আছে। ওই দলটি দু-এক দিনের মধ্যে বাংলাদেশের ভেতরে সম্মুখ সমরে নামবে। অজিত রায়ের ইচ্ছা, ছেলেদের ভালোমন্দ খাওয়াবেন। কিন্তু তিনি ছিলেন অকৃতদার। তাই শামছুল আলম শীলাকে পাঠাতে চান রাঁধুনি হিসেবে। শীলা সানন্দে রাজি হয়েছিলেন। রেঁধে খাইয়েছিলেন দেশের দামাল ছেলেদের। তাদের চোখেমুখে সেদিন শীলা দেখেছিলেন সে প্রত্যয়—আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।

যতবার শীলা ওই সব বীভৎসতার ছবি দেখতেন, ততবারই ডুকরে কাঁদতেন। মা-বাবার জন্য মন পুড়ত। ব্যাকুল হতেন দেশে ফেরার জন্য। যুদ্ধের ক্ষতচিহ্নে পা রেখে রেখে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে দেশে ফেরেন শীলা রায়। দেশে ঢুকেছিলেন রাজশাহী হয়ে। ময়মনসিংহ আসার পর অনেকটা পথ হাঁটতে হয়েছিল। গোটা দেশ তখন শ্মশান। আনন্দ পেতেন কেবল মানুষের চোখ দেখে। সে চোখে বিজয়ের ঝিলিক ছিল। নেত্রকোনা তাঁর নিজের শহর। পা রেখেই আঁতকে উঠেছিলেন—বেঁচে আছে তো মা-বাবা, কাকারা?

নেত্রকোনা সদরের ঠাকুরাকোনায় তাঁদের বাড়ি। ষাটের দশকে টাঙ্গাইল কুমুদিনী কলেজ থেকে পাস করে ময়মনসিংহ শহরের একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালে নারী নেত্রী হেনা দাস তাঁর বিয়ের ঘটকালি করেন। সুনামগঞ্জের সন্তান দেশখ্যাত বিপ্লবী কমরেড বরুণ রায়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তারপর থেকে সুনামগঞ্জেই থাকছেন। এখানেও তিনি শিক্ষক। দীর্ঘ এক যুগ ছিলেন সুনামগঞ্জ মহিলা পরিষদ ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি। সুনামগঞ্জের মানুষ তাঁকে মাতৃজ্ঞানে সম্মান করে।


মন্তব্য