kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সুখবর

বাঘের দেশে আরো বাঘ!

পহেলা মার্চ ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান পড়ে চমকে উঠেছিলেন ইশতিয়াক হাসান। অনেক দিন ধরে ইশতিয়াক ধারণা করছিলেন বাঘ আছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। গার্ডিয়ান শুধু বাঘের পায়ের ছাপ নয়, গাউর, সূর্যভালুকেরও ছবি ছেপেছে। শাহরিয়ার সিজার রহমানসহ একদল গবেষক দীর্ঘদিন কাজ করছিলেন এ নিয়ে

১২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাঘের দেশে আরো বাঘ!

এই পায়ের ছাপটি নিয়েই বেশি কৌতূহল। গবেষকরা প্রায় নিশ্চিত, এটি বাঘের পায়ের ছাপ

সেদিন সিজার রাত কাটিয়েছেন মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা এক ম্রো পাড়ায়। ঘুম ভেঙেছিল খুব ভোরে।

ধারে-কাছে হাঁটাহাঁটি করতে বেরোলেন। একটি লালচে প্রাণী পাশ দিয়ে চলে গেলে ভেবেছিলেন শিয়াল। পেছন থেকে আরেকটি গেল, তারপর আরেকটি। তিনি চমকে উঠলেন। কারণ ওগুলো শিয়াল ছিল না, ছিল ঢোল বা বুনো কুকুর।

কচ্ছপ খুঁজতে গিয়ে

ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (সিসিএ) নামের এক প্রতিষ্ঠানের সহপ্রতিষ্ঠাতা সিজার। বেশি বয়স হয়নি সিসিএর। তবে সিজারসহ আরো কয়েকজন গবেষক তাঁদের পুরনো অনেক কাজ এখন এর আওতায় নিয়ে এসেছেন। সিজার জানালেন, শুরুর দিকে সরীসৃপ নিয়ে আগ্রহ ছিল বেশি।   লাউয়াছড়ায় যেমন অজগরের শরীরে ট্রান্সমিটার বসিয়েছিলাম। তারপর  কচ্ছপের খোঁজ করতে গিয়ে আদিবাসীদের সঙ্গে ওঠা-বসা হয়। তাঁরা চমকে ওঠার মতো খবর বলতেন—যেমন কোনো একটি প্রাণীর ছবি দেখাচ্ছি, মজলিশের কেউ একজন বলল, কয়েক দিন এমন একটি প্রাণী শিকার করে খেয়েছি। চামড়া বা খোলটিও তাঁরা সংরক্ষণ করেনি। তারপর সিজার কয়েকজন আদিবাসীকে ছবি তোলা শেখালেন। বললেন, এরপর থেকে কোনো প্রাণী শিকার করলে খাবার আগে অন্তত ছবিটা যেন তোলে। কিছু দিনের মধ্যেই সিজার আবিষ্কার করলেন—চমত্কার কাজ হচ্ছে এই পদ্ধতিতে। বিপন্ন সব জানোয়ারের ছবি তুলছে তারা। আর তখনই মাথায় আসে ভাবনাটি—আরো প্রশিক্ষণ দিয়ে আদিবাসীদের মাধ্যমে দুর্গম সব জায়গায় ক্যামেরা ট্র্যাপ বসানো যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত বেশকিছু ম্রো, মারমা ও ত্রিপুরা গোত্রের স্থানীয় অধিবাসীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ক্যামেরা ট্র্যাপ পাতা হলো অন্তত ১৪-১৫টি জায়গায়। এ কাজে সাহায্য করার জন্য সিজার ধন্যবাদ দিলেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ হাসান আরিফ রহমান, ড. এসএমএ রশিদ, আবু দায়ান ও সুপ্রিয় চাকমাকে।

 

দারুণ সব প্রাপ্তি

বাংলাদেশ থেকে গাউর বা ইন্ডিয়ান বাইসন বিলুপ্ত হয়েছে ধরে নিয়েছিল অনেকেই। কিন্তু ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়ল গাউরের ছবি। আরো কী কী ধরা পড়ল শুনি সিজার ভাইয়ের মুখ থেকেই, ‘চিতা বাঘ, এশীয় কালো ভল্লুক, সবচেয়ে ছোট প্রজাতির ভল্লুক সান বিয়ার, মেঘলা চিতা, মর্মর বিড়াল বা মারবলড ক্যাট, সম্বর, সোনাবাঘ বা সোনালি বিড়ালের মতো বিপন্ন প্রাণী। আমাদের তখন পাগল হওয়ার দশা! তবে ঘটনা হলো এসব প্রাণী খুব সতর্ক। এমনকি পরিবেশের একটু এদিক-সেদিকও এরা বেশ ভালো বুঝতে পারে। যেমন চিতাবাঘের ছবি ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়ার পর পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, এটা হঠাৎ দিক পরিবর্তন করেছে কিছু একটা সন্দেহ করে। ঢোল, সেরাও (অ্যান্টিলোপ জাতের প্রাণী, বন ছাগলও বলেন কেউ কেউ), চিতা বিড়ালের ছবিও পেলাম। সান বিয়ারদের বেশকিছু ছবি তুলতে পারায় নিশ্চিত হওয়া গেল এরা বেশ ভালো সংখ্যায়ই আছে। ’

বাঘের পা!  

বান্দরবান বা রাঙামাটির বনগুলোতে গত কয়েক দশকে নিশ্চিত করে বাঘের খবর মিলছিল না। যদিও একসময় ওখানে বাঘের রাজত্ব ছিল। এনায়েত মাওলা, ইউসুফ এস. আহমদসহ অনেকের লেখাতেই পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত এলাকার লোকজনের কাছে বাঘ দেখা এমনকি শিকারের খবর পাওয়া গেলেও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল খান শিকার করা বাঘের চর্বি সংগ্রহ করেছিলেন। ২০১১ সালেই নাকি মারা পড়ে বাঘটা! যা-ই হোক, গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে শাহরিয়ার সিজার ও তাঁর সহযোগীরা আবিষ্কার করে ফেললেন বাঘের পায়ের ছাপ! ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে—এমন একজন আরেকজনের কাছ থেকে খবর পান তাঁর জুমের ধারে আছে বাঘের পায়ের ছাপ। ম্রো মানুষটি দৌড়ে গিয়ে ছবি তোলেন। সিজার বললেন, ছড়ার নরম মাটিতে পা পড়ায় ছবিটা শনাক্ত করতে সহজ হয়। ১৩ সেমি দৈর্ঘ্যের ছাপটির ছবি পাঠানো হয় ওয়াইল্ড ক্যাট নিয়ে বিশ্বব্যাপী কাজ করা প্রতিষ্ঠান প্যানথারা’র জ্যেষ্ঠ টাইগার প্রোগাম ডিরেক্টর জন গুডরিচের কাছে। ‘ছবি আর মাপ দেখে এটা বাঘের পায়ের ছাপই মনে করছি আমি। ’—মত প্রকাশ করেছেন গুডরিচ। এদিকে মনিরুল খানও বললেন, ‘ছবি দেখে মনে হয় এটা বাঘেরই পায়ের। ’ বাঘের পায়ের ছাপ যেখানে পাওয়া গেছে সেখানে নতুন করে ক্যামেরা ট্র্যাপ পাতা হয়েছে। ক্যামেরায় বাঘ বন্দি করা গেলেই বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যাবে।

 

গণ্ডার কি আছে?

জানা যায়, একসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্তঘেঁষা বনগুলোতে গণ্ডার ছিল। এমনকি পাড়ার বয়স্ক লোকদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, ছোটবেলায় গণ্ডার দেখেছেন। তবে গাউর বা বাইসনের পাশাপাশি এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে বুনো মোষ চরে বেড়ানোর খবর দেয় স্থানীয়রা। কিন্তু এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। যেমন নিশ্চিত হওয়া যায়নি বার্মিজ ময়ূর এখনো আছে কি না।

 

চাই টাইগার রিজার্ভ জোন

এসব এলাকার অনেকটাই বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এখন সিসিএর সদস্যরা বন বিভাগের সঙ্গে আলাপ করেছেন—পার্বত্য চট্টগ্রামের অরণ্য এলাকাকে টাইগার রেস্টোরেশন জোন ঘোষণা করার জন্য। সেই সঙ্গে জরিপ করে দ্রুত বাঘ সংরক্ষণে পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলছেন।   ‘গ্লোবাল টাইগার ইনিশিয়েটিভ-এ স্বাক্ষরকারী হিসেবে ২০২০ সালে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বাংলাদেশ। আর পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঘের সংখ্যা বাড়ানো তুলনামূলক সহজ’, বলেন মনিরুল খান। একই সঙ্গে সিলেটের সীমান্তঘেঁষা দু-একটি অরণ্যেও বাঘ-চিতাবাঘের থাকার খবর মিলেছে। এসব এলাকায়ও জরিপ চালানো জরুরি।


মন্তব্য