kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ইতিবৃত্ত

একটি তেলের ঘানি

সাভারে আহাম্মদ আলীর তেলের ঘানিটা টিকে আছে শুধু মায়ায়। লাভ-লোকসানের হিসাব করছেন না ছেলেরা। আসলে বাবার স্মৃতি ধরে রাখছেন। লিখেছেন মাসুম সায়ীদ

১২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



একটি তেলের ঘানি

হাটবাজার তখন দূরদূরান্তে। গাঁয়ের ওপর দোকান কদাচিৎ।

ঘরকন্নার নিত্য বেসাতির অনেক কিছুই হেঁকে হেঁকে বিক্রি হতো গাঁয়ে গাঁয়ে। অমলের সেই দইওয়ালা ছাড়াও বাঁকের এক পাশে একটা ঝাঁকা আর অন্য পাশে একটি তেল চিকচিকে পাকা মাটির হাঁড়ি নিয়ে আসতেন একজন। হাঁড়ির ঢাকনির নিচে থাকত তালের বিচির খোলা দিয়ে বানানো বাঁশের হাতলের ওরং। হাঁড়িতে থাকত তেল। ওরংটা তেল তুলে দেওয়ার। লোকটা হেঁকে উঠত—‘তেল রাখবেন, তেল?’ আমরা বলতাম—মুদি এসেছে তেল নিয়ে। বেশির ভাগ এলাকায় এরা কলু নামে পরিচিত। এদের অনেকেই ছিল দরিদ্র। কারো কারো অবস্থা এত করুণ ছিল যে ঘানি টানার একটা গরু কেনাও সম্ভব হতো না। স্ত্রী-পুত্র-কন্যা মিলে বুক দিয়ে ঠেলতে হতো ঘানি। বড় কষ্ট আর ক্লান্তিকর ছিল সে কাজ। আজও ক্লান্তিকর আর কষ্টের কাজকে বলা হয় ‘ঘানি টানা’।

দেশের প্রায় সব অঞ্চল থেকেই উঠে গেছে ঘানি। তবে সাভারের নামাবাজারে হাজি আহমদ আলীর পরিবার আবেগের বশে এখনো টিকিয়ে রেখেছেন ঐতিহ্যবাহী এই ঘানি। তাঁর বড় ছেলে তেলের ব্যবসা করলেও ছোট ছেলে জেলাল আহামেদ স্থানীয় একটি কলেজের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক। ঘানি সম্পর্কে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। তার আগে বলে নিই, নিত্যদিন তরকারিতে তেল খাওয়া একসময় ছিল শহুরে বিলাসিতা। ভাজি-বর্তা আর গায়ে মাখতেই তেলের গরজটা ছিল বেশি। তিল, তিসি, ভেন্না, বাদাম আরো কত কিছুতেই তেল হয়। তবে সরিষার তেল গুণে-মানে সেরা। তাই তার কদরও সব থেকে বেশি। তখনকার দিনে তেল বানানো হতো ঘানিতে। সরিষা, বাদাম, তিল, তিসি ইত্যাদি পিষে তেল তৈরির দেশি যন্ত্রের নাম ঘানি। যন্ত্রের কথা শুনেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক দঙ্গল লোহা-লক্কড়। আর কানে বাজে ঝক্কর ঝক্কর শব্দ।

‘না, ঘানিতে এক বিন্দু লোহাও নেই। এটা তৈরি হয় সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে। তাও অল্পস্বল্প নয়, লেগে যায় প্রায় রীতিমতো আনাম এক গাছ! তাই এর আরেক নাম গাছ। একেকটি অংশ তৈরিতে লাগে একেক ধরনের গাছ বা কাঠ। একেকটা অংশের নামও ভিন্ন ভিন্ন। আট থেকে ১০ ফুট লম্বা একটা কাণ্ডের অর্ধেকের বেশি থাকে মাটিতে পোঁতা। ঘানির এটাই হলো প্রধান অংশ। এটাকে ডাকা হয় ‘গাছ’ নামে। পাকা কড়ই কাঠ এর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। গাছের ওপরে বেড় দেওয়া কাঠের একটা অংশ থাকে, ওটাকে বলে ‘ওড়া’।

এখানেই তেল তৈরির জন্য সরিষা ঢালা হয় সামান্য পানি দিয়ে আউলিয়ে। সরিষা পেষার জন্য লাগে লম্বা কাঠের একটা দণ্ড—এটা দেখতে অনেকটা ঢেঁকির ওঁচা বা ভারী মুগুরের মতো। এর নাম ‘জাইট’। বেলগাছের কাঠ এর জন্য উপযুক্ত। জাইটকে চাপ দেওয়ার জন্য লাগে এক-দেড় হাত লম্বা এক প্রান্ত বাঁকা একটি কাঠ—এর নাম ‘ডেকা’। ডেকার বাঁকানো মাথা টুপির মতো বসে যায় জাইটের মাথায়। অন্য প্রান্ত বাঁধা থাকে একটা ভারী মোটা তক্তার এক প্রান্তের সঙ্গে। এই তক্তাটার নাম ‘কাতাড়ি’। কাতাড়ির এক মাথা অর্ধচন্দ্রাকারে কাটা থাকে। গাছের কোমর বরাবর চারপাশ ঘিরে কাটা হয় একটা খাঁজ। যাতে খাঁজের ভেতরে কাতাড়ির অর্ধচন্দ্রাকার প্রান্তটা খাপে খাপে বসে গিয়ে অবিরত ঘুরতে পারে ও ঘোরার সময় পড়ে না যায়। গাছের নিচের অংশে একটি ছিদ্র থাকে। ছিদ্রটার মুখে লাগানো থাকে একটা কাঠির মতো চিকন কাঠ।

এর নাম পাতাড়ি। এটা দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় তেল গিয়ে পড়ে নিচে রাখা পাত্রে। যেমনটা খেজুরগাছের রস চুয়ে পড়ে হাঁড়িতে। এর সবটাই কাঠের তৈরি। সরিষা পিষে তেল বের করার জন্য কাতাড়ির ওপর রাখা হয় ভারী কোনো জিনিস। কাতাড়ির সঙ্গে গরু বা ঘোড়া জুড়ে চালাতে শুরু করলেই কাতাড়ির বোঝার চাপ গিয়ে পড়ে জাইটের ওপর আর তখন জাইটের পেষণে সরিষা থেকে তেল নির্গত হয়ে পাতাড়ি বেয়ে জমা হয় পাত্রে। ঘানি টানার আবার দুটি ধরন আছে—‘আগঘানি’ আর ‘চিপাঘানি’। আগঘানি হলো শুরুরটা। সরিষা ঢেলে ঘানি জুড়ে প্রথমে বেশ দ্রুত চালাতে হয় গরুকে। এ সময় চালক উঠে বসে কাতাড়ির ওপর। আগঘানিতে সরিষাকে কেবল ভাঙা হয়। তেল পড়তে শুরু করে চিপাঘানিতে। চিপাঘানিতে গরুকে হাঁটনো হয় খুব ধীরগতিতে। গরু যাতে দীর্ঘক্ষণ একমুখী হয়ে হাঁটতে পারে, সে জন্য গরুর চোখে বেতের তৈরি ঠুলি বাঁধা হয়। ঠুলির ওপর আবার বেশির ভাগ সময় দেওয়া হয় কাপড় চাপা। কিছু না দেখে, না বোঝে একটানা অন্ধের মতো ঘুরতে হয় বলে নিরর্থক পরিশ্রমকারী বোঝাতে ঠুলি পরা ‘কলুর বলদ’ বাগধারাটি ব্যবহার করা হয়। ওড়ার ভেতর একসঙ্গে পাঁচ কেজি পরিমাণ সরিষা দেওয়া যায়। যেটা ভাঙাতে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লেগে যায়। মাঝেমধ্যে গরু থামিয়ে একটি কাঠি দিয়ে ওড়াওয়ের ভেতরটা খুঁচিয়ে দিতে হয়। পাঁচ কেজি সরিষা থেকে তেল হয় দেড় থেকে পৌনে দুই কেজি। বিক্রি হয় ২০০ টাকা কেজি দরে।

‘লাভ তো খুব বেশি হয় না, তাহলে?’—অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি।

‘লাভের প্রশ্নে আমরা ঘানি ধরে রাখিনি। এটা আমাদের আবেগের বিষয়। আমার বাবা মানিকগঞ্জের সিংগাইর থেকে ১৯৫৪ সালে সাভার নামাবাজারে এসে প্রথম ঘানি স্থাপন করে তেলের ব্যবসা শুরু করেন। নামাবাজার ছিল আশপাশের ১০-১৫ মাইলের মধ্যে বড় হাট। বিশুদ্ধতার কারণে আমাদের তেলের চাহিদা ছিল একচেটিয়া। সরিষা ছাড়াও তিসি, তিল, বাদাম ইত্যাদিতে তেল হলেও আমার বাবা ঘানিতে সরিষা ছাড়া আর কিছু তুলতে দিতেন না। যার ফলে আমার বাবার সততার কারণেই ব্যবসা বড় হতে থাকল। পরবর্তী সময়ে মিলও হলো। ঘানি দিয়েই ব্যবসা শুরু বলে বাবা যত দিন বেঁচে ছিলেন ঘানিটা ছাড়েননি। আমরাও তাঁর আবেগটাকে সম্মান জানিয়ে ধরে রেখেছি। বিশাল এই জায়গাটাতে যদি আমরা মার্কেট করে ভাড়া দিই, তাহলে লাখ লাখ টাকা ভাড়া পাব প্রতি মাসে। ঘানির তুলনায় মিলের খরচ অনেক কম। উৎপাদন খরচ কম বলে মিলের তেলের দামও পড়ে কম। একটা ঘানিতে দিনে ২০ থেকে ২৫ কেজির বেশি সরিষা ভাঙানো সম্ভব হয় না। অথচ মেশিনে এক মণ সরিষা ভাঙাতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগে না। মিলের সঙ্গে ঘানি পাল্লা দিতে পারবে কেন?

প্রতিটি ঘানি পরিচালনার জন্য দুটি গরু আর একজন লোক দরকার। পশুখাদ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন। অভিজ্ঞতা ছাড়া এ কাজটা নিঁখুতভাবে করতেও পারে না কেউ। লোকজনের বেতন বাড়াতে হয় বছর বছর। তা ছাড়া গাছ বানানোর কাঠ দুষ্প্রাপ্য হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। বেল ও তেঁতুল কাঠ বলতে গেলে পাওয়াই যায় না। বিদেশি একটা কাঠ এখন ব্যবহার করতে হচ্ছে, তাও টেকসই হয় না খুব বেশি। সবচেয়ে বড় কথা—গাছ তৈরির কারিগরও নেই খুব একটা। খরচ বেশি বলে ঘানির তেলের দামও বেশি। সে তুলনায় বাজারে বিকল্প বিদেশি তেলের দাম অনেক কম। তাহলে টিকব কী করে?’

সত্যিই তো! এ প্রশ্নের উত্তর শুধু আমার কেন, কারোরই বোধ হয় জানা নেই। আমি স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি টিনের চালার নিচে কাঠের বেঞ্চটার ওপর। বেঞ্চটার আয়ু ফোরানোর আগেই হয়তো উঠে যেতে হবে ঘানিটিকে। একবিংশ শতকে আবেগের আয়ু আর কতই বা দীর্ঘ হবে?


মন্তব্য