kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


যারা পৃথিবী কাঁপিয়েছে

লাল বইয়ের ৫০ বছর

মাও জে দংয়ের লাল বইটি পৃথিবী কাঁপিয়েছে পুরো এক দশক। দেশে দেশে মানুষকে আশা জুগিয়েছে, দিয়েছে ভাষা। বিদেশি ভাষায় বইটি প্রকাশের ৫০ বছর হলো এবার। লিখেছেন মতিন সরকার

১২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



লাল বইয়ের ৫০ বছর

ষাটের দশকে উত্তাল ছিল সারা পৃথিবী। যুদ্ধ ছিল ভিয়েতনামে।

বামপন্থী আলেন্দের উত্থান ঘটেছিল চিলিতে। সুকর্ন বদলাতে চাচ্ছিলেন ইন্দোনেশিয়া। আরব লড়ছিল ইসরায়েলের সঙ্গে। চাঁদের বুকে মানুষ প্রথম পা দিয়েছে ওই ষাটের দশকেই। আবার গান গেয়ে ওই দশক মাতিয়ে রেখেছিল বিটলস। জন লেনন বাঁধছিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত গান—ইমাজিন অল দ্য পিপল। ওদিকে চীনে মাও জে দং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করছিলেন আর তার হাতিয়ার ছিল একটি বই, মানুষ বইটিকে ডাকে ‘লাল বই’। শুধু চীনে নয়, বইটি ঢেউ তুলেছিল পৃথিবীর নানা প্রান্তে। সেটা ১৯৬৬ সাল। বইটি অবশ্য ‘মাওয়ের উক্তি’ নামে দুই বছর আগেই চীনা ভাষায় প্রকাশিত হয়। ওটি ছিল বুক পকেট সাইজের। পৃষ্ঠা ছিল ২৫০।

অধ্যায় ছিল ৩০টি। বৃষ্টিরোধী ভিনাইল বোর্ডে বাঁধাই করা বইটির মলাট ছিল লাল। পশ্চিমারা নাম দিয়েছিল, লিটল রেড বুক। বাংলায় লোকে বলেছিল, লাল বই। এমন একটি বই প্রকাশের চিন্তা প্রথম মাথায় আসে তখনকার চীনের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান লিন বিয়াওয়ের। মূলত গণমুক্তি বাহিনীর (পিপলস লিবারেশন আর্মি) জন্যই তিনি এটি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। যেন বাহিনীর সদস্যরা মাওয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারে। পরে বইটিকে সাধারণ জনগণের জন্যও ভাবা হয়। কর্তৃপক্ষ চাইছিল, চীনের সব মানুষ যেন তাদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাকে মাওয়ের চিন্তার আলোকে সমাধান করতে পারে।

একপর্যায়ে বইটি পাঠ চীনের মানুষদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়। যেন চীনা কমিউনিস্টদের বাইবেল এটি! দুই বছরের মাথায় চীনের নেতৃত্ব অনুভব করে, এটি ভিনদেশিদেরও কাজে আসবে। তাই ১৯৬৬ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে বিদেশি ভাষায় প্রকাশ শুরু হয়। আমেরিকার বিবলিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির হিসাবমতে, ১৯৬৭ সালের মধ্যে বইটি মুদ্রিত হয়েছে ৭২ কোটি কপি। ওই সংস্করণে দুটি অধ্যায় নতুনভাবে যুক্ত করা হয়। সেই সঙ্গে চেয়ারম্যান মাওয়ের ছোট একটি ছবি। ক্রমে ক্রমে যুক্তরাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন, জাপান, ফ্রান্স, কানাডা, আলজেরিয়া, ইরান, ইতালি, নেপাল, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, পোলান্ড, ডেনমার্ক, জার্মানিসহ ১০০টির বেশি দেশের বুক স্টলে বিক্রি হয়েছে বইটি। এখন বইটিতে আছে ৩৩টি অধ্যায় ও ৪২৭টি উক্তি।

চীনা ভাষায় বইটি প্রকাশের ৫০ বছর পূর্তি আগেই হয়ে গেছে। এ বছর বিদেশি ভাষায় রেড বুকের ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে। ইতিহাসের সর্বাধিক প্রকাশিত বইয়ের তালিকার শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে মাওয়ের লিটল রেড বুক। অনেকের মতে, বইটির ৬৫০ কোটি কপি প্রকাশিত হয়েছে এ পর্যন্ত। আর সর্বকালের সেরা ১০টি বইয়ের মধ্যে রয়েছে লাল বই। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠেছিল এ বই। মুক্তিকামী মানুষ এখনো রণকৌশল খোঁজে বইটিতে। বিবিসি বলছে, কম করেও ৫০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে বইটি।

কিন্তু ওই অতটুকু বইতে আসলে কী ছিল বা আছে? উত্তর জানতে অনেক গবেষণা হচ্ছে, হয়েছে। ধর্মগ্রন্থের বাইরে কোনো বই এত সংখ্যায় প্রকাশের নজির দুনিয়াতে দ্বিতীয়টি নেই। ‘পকেট সাইজ’ হওয়ার ব্যাপারটিও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আসলে ছিল মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। যারা দিশা হারিয়েছিল বা পথ খুঁজছিল, তাদের পথ দেখিয়েছে এ বই।

খোদ চীনেই এ বই ছাপতে ছাপাখানাগুলো এত ব্যস্ত ছিল যে ক্লাসিক্যাল মার্ক্সবাদী লেখা প্রকাশ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বইটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় বিশাল এক সচেতন জনগোষ্ঠী তৈরি করেছিল। ওই মানুষরাই সমাজতান্ত্রিক চীন বিনির্মাণের কারিগর।

তবে অনেকে মত পোষণ করেছেন, বইটি চেয়ারম্যান মাওকে দেবতা বানিয়ে ফেলে। ফলে মাওয়ের ব্যক্তিপূজা (কাল্ট পার্সোনালিটি) শুরু হয়ে যায়। বইটি সমাজ অভ্যন্তরে বিশ্বাসগত সংঘাত ঘটিয়েছে বলেও মত প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। আলবেনিয়ার সমাজতান্ত্রিক নেতা আনোয়ার হোজা বলেছেন, অল্পবয়সী ছেলেদের হাতে লাল বই তুলে দিয়ে তাদের চিৎকার করার অধিকার দেওয়াটা ঠিক হয়নি। তবে আসল বিষয় ছিল, নির্যাতিত মানুষ বইটিতে আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল।

আমেরিকার ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টির শত শত যুবক মাওয়ের লাল বই পকেটে রাখা দায়িত্ব মনে করত। এ কারণে অনেককে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কেউ কেউ মৃত্যুযন্ত্রণাও ভোগ করেছে।    

লাল বইয়ের আলোড়ন দেখা গিয়েছিল ভারতবর্ষেও। নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছেলেমেয়েরা লাল বই হাতে মাওবাদে দীক্ষা নিয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তারা বলত, চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান। চারু মজুমদার ছিলেন তাদের নেতা। ছেলেমেয়েরা লাল বই হাতে মাইলের পর মাইল হেঁটে গিয়ে পাঠচক্র করত, করত পথসভা। ওই শিক্ষিত পদাতিকরা মাওয়ের গেরিলা ওয়ারফেয়ারেরও ভক্ত ছিল। লাল বইটি ছিল তাদের প্রেরণার উৎস।

বইটি নানা বিষয়ে আলোকপাত করেছিল। যেমন—শ্রেণি সংগ্রাম, গণযুদ্ধ, ভুল শুধরে নেওয়া, গণলাইন, জনগণকে সেবা করা, পড়ালেখা, নারী, যুবক প্রভৃতি। উক্তিগুলোর কোনোটি এক বাক্যের, কোনোটি বা কয়েক বাক্যের।

তবে বিশ্বের প্রায় সব দেশের পুলিশেরই চক্ষুশূল ছিল বইটি। লাল বই পেলেই তারা লাঠি চালাত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশে দেশে গণতন্ত্র ফেরি করে বেড়িয়েছে তখন আবার নিজের দেশের মুক্তিকামীদেরও পিটিয়েছে বেধড়ক। ভারতে নকশালদের নৃশংসভাবে দমনের জন্য আজও নিন্দিত হয় ইন্দিরা সরকার। সে সময়ের ভারত সরকার জরুরি আইন জারি করে ‘ক্রিম অব দ্য সোসাইটি’ বলে পরিচিত নকশালদের দমন করে গণতন্ত্রকে কালিমালিপ্ত করেছে।

লাল বইয়ের স্বর্ণযুগের সমাপ্তি ঘটেছে বলতে গেলে এক দশকেই। মাও মারা যান ১৯৭৬ সালে। দেং জিয়াও পিং ১৯৭৮ সালে ক্ষমতায় আসেন, লাল বইকে বাম বিচ্যুতির দোষে দুষ্ট করা হয়। চীনা কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় বহির্বিশ্বেও এর গুরুত্ব কমতে থাকে। একইভাবে পৃথিবীর নানা প্রান্তে বইখানির গুরুত্ব কমে যায়। তবে লাল বইয়ের গুরুত্ব আবার তৈরি হয় আশির দশকে। নেপালে যেমন, ফিলিপাইনে, এমনকি নব্বইয়ের দশকে চীনেও। ২০১৩ সালে চীনের অনেক বইয়ের দোকানে আবার লাল বই দেখা গেছে।


মন্তব্য