kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভিনদেশির বাংলাদেশ

সাকিয়ার ছবি দেখার পরে

করিনা টমাশেট সুইজারল্যান্ডের মেয়ে। এক মাস ঘুরলেন-ফিরলেন বাংলাদেশে। দেখলেন নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, বরিশাল, কক্সবাজার, সুনামগঞ্জসহ আরো অনেক জায়গা। টাঙ্গুয়ার হাওরে রাত কাটিয়েছেন। বাসের ছাদে চড়েছেন। করিনার বাংলাদেশ লিখেছেন নাদিম মজিদ

১২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সাকিয়ার ছবি দেখার পরে

কচি ধানের ঘ্রাণ নিচ্ছেন করিনা

আগস্টের বিকেল। খুব চাপ যাচ্ছে।

মেডিক্যালের সমাপনী পরীক্ষা বলে কথা! বিরতি নিতে কম্পিউটার খুলে বসলেন। গেলেন ট্রাভেলেটস নামের একটি সাইটে। দেখতে দেখতে একটা ছবিতে চোখ আটকে গেল—সবুজ গাছগাছালিতে ভরা একটি পাহাড়। ছবির নিচের লেখা থেকে জানলেন এটি বাংলাদেশের একটি পাহাড়ের ছবি। আগ্রহী হয়ে আরো জানলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ। এখানে দেখার মতো অনেক সুন্দর জায়গা আছে।   করিনা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেললেন, করিনা ছুটিতে ঘুরবেন দক্ষিণ এশিয়া। থাকবেন বাংলাদেশে। সম্ভব হলে লম্বা সময়।

ছবিটি ছিল সাকিয়ার

ট্রাভেলেটসে পোস্টটি দিয়েছিলেন সাকিয়া হক। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের এমবিবিএস পঞ্চম বর্ষের ছাত্রী। ছবির নিচে ‘ওয়ান্ডারফুল’ বলে মন্তব্য করেন করিনা। দুজনের আলাপ-পরিচয় হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় বেড়াতে আসতে চান বলে জানান করিনা। ঘুরে দেখতে চান বাংলাদেশ। সাকিয়া রাজি হন তাঁর গাইড হতে। ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশে আসেন করিনা। ঢাকায় হোটেল অরনেট ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলে ছিলেন।

বেড়িয়েছেন যেখানে

করিনা দেখতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো। গ্রামের মানুষ দেখারও শখ ছিল। সাকিয়া তাঁকে ঢাকায় দেখিয়েছেন জাতীয় জাদুঘর, চারুকলা অনুষদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, লালবাগ কেল্লা, আহ্ছান মঞ্জিল, বুড়িগঙ্গা নদী এবং স্বাধীনতা জাদুঘর। ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রথম প্রহরে ছিলেন শহীদ মিনারে। জাহাঙ্গীরনগরে যেদিন গিয়েছিলেন সেদিন চলছিল পাখি মেলা।

ঢাকার বাইরে বরিশাল, কুয়াকাটা, খুলনা, বাগেরহাট, সুনামগঞ্জ, সোনারগাঁও, টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন ও সুন্দরবন গিয়েছেন। কুয়াকাটায় নিজেই বানিয়েছেন বালির প্রাসাদ। বরিশাল গিয়ে হাত দিয়ে খেতে শিখেছেন।

বাসের ছাদে করিনা

কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়—বলেছিলেন সাকিয়া। তর সইছিল না   করিনার। সাকিয়া জুটিয়ে নিয়েছিলেন দুই বন্ধু তুলি আর কিবরিয়াকে। ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে সমুদ্রসৈকতের পাশে হোটেল অরোরাতে গিয়ে ওঠেন তাঁরা। সূর্যোদয় দেখে ফিরছিলেন খুলনায়। পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় এসে করিনার মনে হলো—বাসের ছাদে যে চড়া হয়নি। সবাই মিলে হই হই করে ছাদে উঠে গেলেন। সেলফিও তুলেছেন।

নৌকায় রাত যায়

খুলনায় গিয়ে ফেসবুকে সাকিয়া একটি পোস্ট দেখেছিলেন—টাঙ্গুয়ার হাওরে রাত কাটাতে যাচ্ছে ‘বিন্দাস’ নামে একটি গ্রুপ। ব্যাকপ্যাকার দলটি যাবে লক্কড়ঝক্কড় বাসে। পথে লেগুনা, হোন্ডা আর নৌকাযাত্রা শেষে পৌঁছানো যাবে টাঙ্গুয়ায়। রাতে টাঙ্গুয়ায় থেকে ফেরার সময় জাদুকাটা নদী, চুনাপাথরের লেক নীলাদ্রি আর বারিক্কার টিলা দেখবেন। করিনাকে ব্যাপারটি জানাতেই রাজি হয়ে গেলেন। ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে তাঁরা সুনামগঞ্জ রওনা হন। বিন্দাস দলে সদস্য সংখ্যা ২৯ জন। সাকিয়া, করিনা ছাড়াও শ্রাবন্তী আর আরজুমান নামে আরো দুজন মেয়ে। বাসেই তাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায় করিনার। টাঙ্গুয়ার হাওরে পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল। হাওরে পানি কম। পানি শুকিয়ে যাওয়া স্থানে সবুজ ঘাস উঠেছে। পাড়ে গাছ-গাছালি। শীত তখনো ছিল টাঙ্গুয়ায়। হালকা কম্বলে মানিয়ে যায়। করিনা বলছিলেন, ‘কোথাও গেলে আমি প্রথম নিরাপত্তার কথা ভাবি। এখানে সাকিয়াকে সঙ্গী হিসেবে পেয়ে আমার সব ভয় চলে গিয়েছিল। দলের অন্যরাও ছিল বন্ধুবৎসল। এত মজা করেছি যে ভয় মনে আসেনি। পানির ওপর শুয়ে থাকার মজাই আলাদা। ’

কিনেছেন রিকশা পেইন্টিং

বাংলাদেশে এসে রিকশা পেইন্টিংয়ে মুগ্ধ হয়েছেন করিনা। তাজমহল এবং বাঘের ছবিওয়ালা দুটি রিকশা পেইন্টিং কেনেন তিনি। বললেন, ‘রিকশা পেইন্টিং দেখে মুগ্ধ হয়েছি। তাই একদিন গিয়ে পছন্দের দুটি পেইন্টিং কিনে নিয়ে এসেছি। ’

ছিল পূর্বপ্রস্তুতি

আসার আগে বাংলাদেশ সম্পর্কে জেনেছেন। এ দেশের মানুষ কী ধরনের পোশাক পছন্দ করে, কী ধরনের খাবার খায় তা জেনেছেন। জেনেছেন, এ দেশ মুসলিম প্রধান। তাই প্রায় সময় সালোয়ার-কামিজ পরেছেন। ‘আমি আগে তুরস্কে বেড়াতে গিয়েছিলাম। তাই কিছু অভিজ্ঞতা ছিল। আমি বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে মিশতে চেয়েছি। তাই এ দেশের মানুষের পছন্দের পোশাক পরে প্রায় সময় বেড়াতে যেতাম। শাড়িও পরেছি কখনো কখনো। ’

সুন্দর দেশ বাংলাদেশ

‘বাংলাদেশ সুন্দর একটি দেশ। এখানে অনেক সবুজ। তবে ঢাকা শহর আমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগে। এত মানুষ!’ জানান করিনা টমাশেট। ‘বাংলাদেশের মানুষ বন্ধুবৎসল। তারা আমাকে অনেক সময় দিয়েছে। এখানে থাকার সময় আমি প্রচুর লাঞ্চ এবং ডিনারের দাওয়াত পেয়েছি। অনেকগুলোয় অংশ নিয়েছি। ’

ধন্যবাদ সাকিয়া

বাংলাদেশে আসার আগে তিন সপ্তাহ শ্রীলঙ্কায় ছিলেন করিনা। ভারতেও থাকবেন তিন সপ্তাহ। তবে বাংলাদেশে থেকেছেন এক মাস। কারণ সাকিয়া। ‘সাকিয়াকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। সে আমাকে পুরো সময় দিয়েছে। আমার সঙ্গে বেড়ানোর জন্য টাকা জমিয়েছে। তার সঙ্গে বেড়িয়ে আমি নিশ্চিন্ত ছিলাম। সে না থাকলে এত জায়গায় ঘোরার সাহস হয়তো করতাম না। ’


মন্তব্য