কেলুচরণের নাম লইলাম-332201 | অবসরে | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


ঢাকার অতিথি

কেলুচরণের নাম লইলাম

গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের শিষ্য তিনি। ঢাকায় এসেছিলেন ১৩ ফেব্রুয়ারি। তিনি সুতপা তালুকদার। ভারতের প্রখ্যাত ওড়িশি নৃত্যশিল্পী। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন মাসিদ রণ। ছবি তুলেছেন সজল

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কেলুচরণের নাম লইলাম

খুব গুছিয়ে স্পষ্ট বাংলায় মিষ্টি করে কথা বলেন সুতপা তালুকদার। বলতে লাগলেন, ‘আমার গুরু পদ্মবিভূষণ কেলুচরণ মহাপাত্রের কাছ থেকেই ধৈর্যের শিক্ষা পেয়েছি। আজকের এই আমি, সব তাঁরই কল্যাণে। তাঁর কাছ থেকে ২৫ বছরে যা পেয়েছি, তার কতকটা শেখাই ছাত্রছাত্রীদের।  পুরোটা হয় কি না জানি না, তবু চেষ্টা করে যাই। গুরুজি একজন মহামানব। আমি দেখেছি, অনুভব করেছি, তাঁর মধ্যে ঈশ্বরের বাস ছিল। নয়তো একটি লোক কিভাবে ভোরে তালিম দিতে বসে বিকেল চারটা বাজিয়ে ফেলতে পারতেন! নাচ তাঁকে নাওয়া-খাওয়া ভুলিয়ে দিত। সময় সময় গুরুজিকে জিজ্ঞেস করতাম, আপনি লেখাপড়া জানেন না তেমন, কখনো কোনো বইও পড়তে দেখি না; তাহলে এই উচ্চমার্গীয় চিন্তাভাবনা, সূক্ষ্ম জীবনবোধ কোথায় পান? তখন তিনি একেবারেই বাচ্চাদের মতো মুখ করে বলতেন, ‘আমি তো এত কিছু ভাবি না রে। নাচের মুদ্রা বা কম্পোজিশনগুলো আমার চোখের সামনে দিয়ে সিনেমার দৃশ্যের মতো একটার পর একটা চলে যেতে থাকে। আর আমি শুধু তা থেকে যেটা নিজের ভালো লাগে সেটা ধরে তোদের মধ্যে দিয়ে দিই।’ তখন খুব রাগ হতো তাঁর হেঁয়ালিপনা দেখে। কিন্তু এ একই ব্যাপার এখন আমার সঙ্গেও ঘটে। আমি তা আমার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দিয়ে দিই। এটা হয়েছে গুরুজি ২০০৪ সালে চলে যাওয়ার পর থেকে।

আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আমার ছোটবেলায় কলকাতায় শাস্ত্রীয় নৃত্য বেশিজন করত না। ভরতনাট্যম আর ফোকগানের কিছু চল ছিল। ওড়িশি নাচ ছিলই না। আমার আগ্রহ দেখে বাবা আমাকে গুরুজির বাড়ি কটকে পাঠান। সেখানে ১৯৮১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত একনাগাড়ে তাঁর কাছে শিখেছি।’

সুতপাদি কলকাতায় নিজের স্কুল করেছেন ‘গুরুকুল’ নামে। এর বয়স এখন ৩০ বছর হতে চলল। এই স্কুলের  উদ্বোধন করেছিলেন কেলুচরণ মহাপাত্র। স্কুলটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মায়ার খেলা’, ‘শ্যামা’সহ আরো অনেক নান্দনিক প্রযোজনা মঞ্চে আনে।  তিনি ওড়িশা, কটক ও ভুবনেশ্বরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে বিভিন্ন মুদ্রা সংগ্রহ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, ‘বাঁধাধরা সাধনায় হবে না। নিজেকে ভেঙে গড়তে হবে।’

বলছিলেন, শ্যামা যখন করেছি, সেখানেও বজ্রসেন আর শ্যামাকে আমি দূরে দূরে রাখিনি। নাচতে নেমে শরীর ছোঁব না, নারী-পুরুষে ঘনিষ্ঠ হব না, তা তো হয় না। আমার নৃত্যনাট্যে যখন বজ্রসেন শ্যামাকে প্রত্যাখ্যান করবে, তখন শ্যামা তার প্রেমিকের বুকে আছড়ে পড়ে কেঁদেছে। ওই রকম একটা আবেগঘন মুহূর্তে ধরি মাছ না ছুঁই পানি—দূরত্ব থাকতে পারে না নায়ক-নায়িকার।’

‘কৃষ্ণভাবমাধুরী’ নৃত্যনাট্যে কৃষ্ণের জন্ম থেকে কুরুক্ষেত্রলীলা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি শিল্পীদের মুখে এঁটেছেন মুখোশ, শিল্পীদের পরিয়েছেন ওড়িশি পটচিত্র ঢঙের পোশাক। পুরোহিতরা পুজোর সময় হাতের যেসব মুদ্রা করেন সেসব এনেছেন নাচে।

তাই তো পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক তাঁকে নতুন এক দায়িত্ব দিয়েছে। আর তা হলো, সাধারণ হিন্দু ধর্মের মানুষ যখন পূজা-অর্চনা করে, সে সময় যেসব শারীরিক ভঙ্গি ও হাত-পায়ের মুদ্রা ব্যবহার করে, সেগুলো নাচের মধ্যে নিয়ে আসা ও জনপ্রিয় করে তোলা। যেহেতু বেদ থেকে মানুষ এই মুদ্রাগুলো পেয়ে থাকে, তাই এই নাচের নাম দেওয়া হয়েছে বৈদিক নৃত্য। তিনি ছাত্রছাত্রীদের শরীরচর্চা, ভাষাজ্ঞান, মেকআপ, হেয়ার ও কস্টিউম ডিজাইনও শেখান। টালিগঞ্জের শিল্পীদের মধ্যে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তা তাঁর ছাত্রী ছিলেন। বলছিলেন, ‘চমত্কার পারফরমার ঋতু। আমি ওকে বলেছিলাম, বলিউডে হেমা মালিনী, বৈজয়ন্তি মালার মতো আমাদের এখানে নাচ জানা নায়িকা নেই। তুমি নাচটা ধরে রেখো।’ ঢাকা ভালো লাগে সুতপাদির। এখানকার মানুষ খাওয়াতে জানে।

মন্তব্য