যেখানে সত্য হলেন আইনস্টাইন-332198 | অবসরে | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


বিজ্ঞানবাড়ি

যেখানে সত্য হলেন আইনস্টাইন

সত্য হতে আইনস্টাইনকে ১০০ বছর অপেক্ষা করতে হলো। কারণ লাইগো নামের গবেষণাগারটি গড়ে তোলা সহজ ছিল না। কঠিন কাজের কঠিন এই গবেষণাগারের বর্ণনা দিয়েছেন আনোয়ার হৃদয়

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



যেখানে সত্য হলেন আইনস্টাইন

এলআইজিও বা সংক্ষেপে লাইগো, যার পুরো মানে হলো—লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নির্ণয়কারী গবেষণাগার, যা দুটি পৃথক স্টেশন নিয়ে গঠিত। এর একটি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের হ্যানফোর্ডে এবং অন্যটি লুইজিয়ানার লিভিংস্টোনে অবস্থিত। দুটির মাঝে দূরত্ব প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার। প্রতিটি লাইগোতে আছে দুটি লম্বা নল। নলগুলো বায়ুশূন্য এবং চার কিলোমিটার লম্বা। এগুলোর ব্যাস ১.২ মিটার করে। দুটিই ১০ ফুট কংক্রিটের দেয়াল দিয়ে মোড়ানো।

লাইগোর প্রধান উদ্দেশ্য, লাখ লাখ আলোকবর্ষ দূর থেকে আগত মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা। আরেকটি বড় উদ্দেশ্য—প্রকৃত ব্ল্যাক হোল এবং আইনস্টাইনের বর্ণিত ব্ল্যাক হোলের মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজে বের করা। এ ছাড়া মাত্রাতিরিক্ত ঘনত্বে পদার্থ কী রকম কাজ করে, দানবাকৃতির তারা, সুপারনোভা, হাইপারনোভা, ব্ল্যাক হোল এবং জোড়া ব্ল্যাক হোল থেকে ঠিক কেমন মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উত্পত্তি হয় এবং ঠিক কত সময় আগে হয়—এসব পর্যালোচনা করাও লাইগোর কাজ।

মজার ব্যাপার হলো, লাইগো কাজ করে অনেকটা শূন্যে ভাসমান পাখির ডানা এবং মানুষের কানের মতো। সাধারণ মানুষ লাইগোকে নাসা বা হাবল টেলিস্কোপের মতো কোনো একটি গবেষণাগার ভেবে ভুল করতে পারে, যদিও এটি মহাকাশ থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নির্ণয়ের কাজ করে।

একে মহাকাশ গবেষণাগার বলা যাবে না মূলত তিনটি কারণে।

প্রথমত, লাইগো হলো অন্ধ। এর মহাকাশ পর্যবেক্ষণকারী টেলিস্কোপের মতো অত্যাধুনিক কোনো লেন্স নেই, যার সাহায্যে দূর আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র কিংবা অতিকায় রহস্যময় কোনো কিছু থেকে নিঃসৃত তড়িৎচৗম্বকীয় বিকিরণ পর্যালোচনা করে তার অস্তিত্বের ব্যাখ্যা দিতে পারে। লাইগো সেসব তড়িৎচৗম্বকীয় বিকিরণ একদমই দেখতে পায় না।

দ্বিতীয়ত, যেহেতু লাইগোকে বেতার তরঙ্গ বা আলোর সাহায্যে ফোকাস করতে হয় না, তাই টেলিস্কোপের মতো এটি গোলাকার নয়; বরং এটি সুদীর্ঘ বায়ুশূন্য এক নল, যা মহাকর্ষীয় তরঙ্গকে শোষণ করে দীর্ঘ নলের মধ্য দিয়ে প্রেরণ করে।

তৃতীয়ত, লাইগো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা একা কাজ করতে পারে না। দুটি দূরবর্তী ইন্টারফেরোমিটার পরস্পরের মধ্যে সামঞ্জস্য সৃষ্টির মাধ্যমে নিখুঁত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ অনুধাবন করতে পারে।

আপেক্ষিক তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানের এক কল্পিত জগতের বাস্তবিক রূপদানের ধৃষ্টতা নিয়ে ১৯৯৪ সালে প্রথম লাইগোর জন্ম হয়। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব  টেকনোলজি (ক্যালটেক) এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ পাঁচ বছর গবেষণা করে ১৯৯৯ সালে লাইগো প্রকল্পটি সম্পূর্ণ করেন। এরপর ২০০২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে একে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের খোঁজে লাগান তাঁরা, এবং তা ২০১০ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে। কিন্তু লাইগো সবার প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়।

তারপর লাইগোকে পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করার জন্য আবার গবেষণা শুরু হয় এবং ২০১৪ সালে নতুন আধুনিক শক্তিশালী এক লাইগোর আবির্ভাব হয়, যার ক্ষমতা আগেরটির তুলনায় এক হাজার গুণ। অর্থাৎ নতুন লাইগো মহাকাশের এক হাজার গুণ বেশি জায়গাজুড়ে কাজ করতে পারে। বলা হচ্ছে, ছোটবড় প্রায় ১০ হাজার গ্যালাক্সি অতিক্রম করতে পারে লাইগোর ডিটেকশন ক্ষমতা।

আধুনিক লাইগোর ক্ষমতা সত্যিই বিস্ময়কর। এটি একটি প্রোটনের প্রস্থের ১০ হাজার ভাগের এক ভাগের ক্ষুদ্রতম নড়াচড়াও অনুধাবন করতে পারে। ধরতে পারে এক থেকে ১০ হাজার হার্টজের তরঙ্গদৈর্ঘ্য। ফলে মহাবিশ্বের দূরতম অঞ্চলে সংঘটিত মহাজাগতিক সংঘর্ষের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করতে পারে।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বায়ুশূন্য প্রকোষ্ঠ লাইগো, যার আয়তন ১০ হাজার ঘনমিটার এবং ৪০০ বোয়িং বিমানের এতে জায়গা হবে অনায়াসে। এত বিশাল আয়তনের জায়গা বায়ুশূন্য করতেও সময় লাগে প্রায় ৪০ দিন। ফলে লাইগোর অভ্যন্তরে এক বিশাল চাপের সৃষ্টি হয়, যা ভূপৃষ্ঠের চেয়ে প্রায় এক লাখ গুণ বেশি।

লাইগোর বায়ুশূন্য হাত দুটি এতই বড় যে প্রতি চার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে পৃথিবীর বক্রতা নির্ণয় করা যায়।

সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে লাইগোর আরেকটি ইন্টারফেরোমিটার স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে পৃথিবীতে আছড়ে পড়া মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আরো সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করা যায়।

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কংগ্রেসে এর অনুমোদন দেন।

আইনস্টাইন আপেক্ষিক তত্ত্বে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তার সত্যতা প্রমাণ করে আধুনিক বিজ্ঞানে এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে লাইগো। এই আবিষ্কারের ফলে পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন দ্বার উন্মোচিত হলো। ভবিষ্যতে আরো বিস্ময়কর কিছু আবিষ্কৃত হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।

মন্তব্য