এখন আর ভিক্ষা করেন না জাকির-332196 | অবসরে | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


জীবনের জয়গান

এখন আর ভিক্ষা করেন না জাকির

প্রথম প্রথম জাকির ভিক্ষা করতেন। কিন্তু তিনি বাঁচতে চেয়েছিলেন সম্মান নিয়ে আর ১০ জন যেমন বাঁচে। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থেকে জাকিরের খবর পাঠিয়েছেন আলম ফরাজী

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



এখন আর ভিক্ষা করেন না জাকির

জাকিরের পছন্দ

ফুটবল খেলা খুবই পছন্দ করেন জাকির। ক্রিকেট আরো বেশি। আরো পছন্দ করেন বাউল গান।

 

জাকিরের ইচ্ছা

এক খণ্ড জমি কিনেছেন জাকির। সেখানে একটি পাকা মেঝের বাড়ি করার ইচ্ছা তাঁর। জাকির বলেন, ‘আগে তো পরের জায়গায় ঘিঞ্জি ঘরে ছিলাম। বাড়িটা হয়ে গেলে মা-বাবাকে আলাদা ঘর দেব। যেন তাঁরা নিজেদের মতো থাকতে পারেন।’

পরিবারটি চলছিল টেনেটুনে। তার মধ্যে অচল দুই পা নিয়ে জন্মাল দ্বিতীয় সন্তান। মা-বাবা পড়লেন বিপদে। আরো দুই সন্তান জন্মালে বাবার আর উপায় থাকল না। তিনি আগে থেকেই ছিলেন ‘অসুইখ্যা’। ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমে গেলেন। এরপর এমন দিন এলো, বাবা আর ভিক্ষা করতেও যেতে পারছিলেন না। এমন অবস্থায় সেই পঙ্গু ছেলে, যাঁর নাম রাখা হয়েছিল জাকির, সংসার এসে পড়ল তাঁর ঘাড়ে। বাবার ভিক্ষার থালা নিয়ে বের হয়ে গেলেন। ১০ বছর করেছেন ভিক্ষা। কিন্তু তিনি চাইতেন সম্মানের জীবন, রোজগারের জীবন। লোকজন শুনে হাসত, বলত, ‘লুলা’র শখ দ্যাখো! কিন্তু দমে যাননি জাকির। ইচ্ছা তাঁকে বড় করেছে। তিনি এখন শারীরিকভাবে স্বাভাবিক অনেক মানুষের চেয়েও বড় জীবনযাপন করেন। ভিক্ষার হাত ধরেছে এখন ইজিবাইকের স্টিয়ারিং। দিনে রোজগার ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। তাঁর পুরো নাম জাকারিয়া জাকির। গ্রামের নাম নাউড়ি, উপজেলা-ঈশ্বরগঞ্জ, জেলা-ময়মনসিংহ। বয়স ২০ বছর।

জাকিরের ইজিবাইক চলে মধুপুর-দেওয়ানগঞ্জ সড়কে। একেকবারে ১০ জন ওঠান। একজন নামলে তার জায়গায় আরেকজনকে নেন। প্রতিদিন অন্তত সাতটা ট্রিপ দেন জাকির। ‘লুলা’ বলে কেউ জাকিরের গাড়িতে উঠতে দ্বিধাবোধ করেছে—এমন খবর আমরা সাংবাদিকরাও পাইনি। বরং তাঁর হাসিমাখা মুখ মানুষকে কাছে টানে। তিনি গাড়িতে বরং কিছু বেশি লোকই পান। বাইকটি নিজের মতো তৈরি করে নিয়েছেন, যাকে বলা যায় ‘কাস্টমাইজ’ করা। এটি করতে হয়েছে কারণ তিনি পা দিয়ে ব্রেক চাপতে পারেন না। ব্রেক থেকে একটি লোহার স্টিক ঝালাই দিয়ে হাতের কাছে  রেখেছেন। হাত দিয়েই প্রয়োজনমতো ব্রেক চাপেন। সাইফুল নামের এক যাত্রীর সঙ্গে কথা বললাম। তখন সোহেল, কদ্দুস মিয়া আর আবেদ আলীও ছিলেন। তাঁরা প্রায়ই জাকিরের গাড়িতে চাপেন। সাইফুল বললেন, ‘জাকিরকে ড্রাইভিং অবস্থায় দেখলে কেউ বলতে পারবে না তার দুই পা নেই। অন্য যেকোনো চালকের সঙ্গে সে পাল্লা দিতে পারে।’ অন্য যাত্রীরাও সায় দিলেন সাইফুলের কথায়।

সাইফুল আরো যোগ করলেন, ‘এই আমিই একসময় জাকিরকে বাজারে ভিক্ষা করতে দেখেছি। আমরাই ভিক্ষা দিয়েছি। আর এখন তার গাড়িতে উঠে প্রাপ্য ভাড়া দিই।’ মধুপুর বাজারের ব্যবসায়ী বাপ্পী বলেন, ‘‘এই জাকিরকে দেখেছি মানুষের কাছে হাত পাততে।  সেই ‘অচল’ যেভাবে আজ ইজিবাইক চালায়, যাত্রী আনা-নেওয়া করে, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।”

জাকিররা দুই ভাই, দুই বোন। মা জাহানারা আগে অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। এখন ছেলের রোজগার পেয়ে নিজের বাড়ি সামলান। তিনি এখন গৃহকর্ত্রী। বাবা ফজলুল হক জমি বর্গা নেন। মজুর দিয়ে ধান আবাদ করেন। জাকির বলেন, “জন্ম থেকেই আমার দুই পা অচল ছিল। সাত-আট বছর বয়সে ভিক্ষায় নামি। বাবা ফজলুল হক কোলে-কাঁধে করে বাজারে বা পথেঘাটে রেখে আসতেন। সন্ধ্যার পর আবার বাড়ি নিয়ে যেতেন। আমার ভালো লাগত না। একসময় বাবা যখন ভীষণ অসুস্থ, তখন ইজিবাইকের যাত্রী হয়ে বাড়ি যেতে হতো। একদিন ভাবি, আমি কি ইজিবাইক চালাতে পারব না? এই ভেবে কয়েকজন ইজিবাইক মালিকের কাছে যাই। আমাকে ‘লুলা’ দেখে কেউ ভরসা করতে পারত না। কিছু কিছু টাকা জমাতে শুরু করি। কিছু টাকা ধার করি। একদিন একটি ইজিবাইক কিনে ফেলি। প্রথম প্রথম কষ্ট হতো। কিন্তু এখন আমি পাকাপোক্ত। আমার নিজের নতুন একটি বাইক আছে। ছয়জনের সংসার চালাই আমি একলা।”

জাকিরের মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘ওই সব দিনে ছেলেকে এক জায়গায় বসিয়ে স্বামী-স্ত্রীও ভিক্ষায় গেছি। এরপর ছেলের সাহস দেখে টাকা জমাইছি, ঋণ নিছি। এখন আমরা ইজিবাইকের মালিক। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে আবাদ করি। কাঁথা সেলাইয়ের কাজও করি। আমাদের ছেলে জাকির এখন সুস্থ মানুষের মতোই আয়-রোজগার করে।’

জাকিরকে লোকে এখন ড্রাইভার বলে চেনে, লুলা নাম ঘুচে গেছে। ড্রাইভার জাকির বোনের বিয়ে দিয়েছেন আধা লাখ টাকা খরচ করে। ছোট বোন তামান্নাকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন।         ছবি : লেখক

মন্তব্য