kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সাহস রাখে বাংলাদেশ

ছবি তাঁকে ডেকেছিল

টাইম সাময়িকী আশ্চর্য হয়েছে জেনে, মাত্র এক ডলার রোজে কাজ করে যমুনার চরের মেয়েরা। উল্টোদিকে ছবির টানে চাকরি ছেড়েছেন জাকির হোসেন চৌধুরী। সত্যি সাহস রাখে বাংলাদেশ! এখন জাকিরের ছবি প্রায় নিয়মিতই প্রকাশ করে টেলিগ্রাফ, গার্ডিয়ান বা সিএনএন। লিখেছেন সানজাদুল ইসলাম সাফা

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ছবি তাঁকে ডেকেছিল

জাকিরের তোলা এই ছবিটি ‘পিকচার্স অব দ্য ডে’ শাখায় প্রকাশ করে দ্য টেলিগ্রাফ

 

২৩ ফেব্রুয়ারি জাকির গিয়েছিলেন গাইবান্ধার যমুনায়। চরের চাতালে  মেয়েরা মরিচ শুকাচ্ছিল।

শুনলেন তাদের গল্প। জানলেন, ৭০ টাকা রোজ তাদের। এক রোজ সমান ১০ ঘণ্টা। এর মধ্যে দেখলেন ছোট মেয়েরা মায়ের সঙ্গে যাচ্ছে স্কুলে। ক্যামেরার বাটন চাপলেন। একটা নয়, অনেকগুলো। ঢাকায় ফিরেছিলেন রাতে। তুরস্কের এনাডুলা এজেন্সির ওয়েবসাইটে অ্যাপ করলেন ছবিগুলো। তারপর ২৭ ফেব্রুয়ারি টাইম ম্যাগাজিন ইনস্ট্রাগ্রামে ছবিগুলো প্রকাশ করে।

 

ছবিটি নিয়ে

জাকির বললেন,  মঙ্গাপীড়িত এলাকা গাইবান্ধা। নদী তীরবর্তী মানুষগুলো বেশি করে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার। বর্ষায় তাদের ঘরবাড়ি ডুবে যায়। শুকনা মৌসুমে আবার খরায় পড়ে। সারা দিন কাজ করে পায় মোটে ৭০ টাকা। এই টাকায় কিভাবে চলে? স্বপ্ন কি দেখার সাহস করে? এসব জানতে গিয়েছিলাম গাইবান্ধার যমুনায়।   

জাকিরের ছবি দ্য গার্ডিয়ান, ওয়াল স্ট্রিট, সিএনএন, নিউ ইয়র্ক টাইমস, টেলিগ্রাফ, ডেইলি মেইল, মিরর, মর্নিং এক্সপ্রেস, ম্যাশেবলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রায় নিয়মিত প্রকাশ পায়।

আগেও অনেকবার

রেড ফর ডেঞ্জার নাম দিয়ে তাঁর একটি ছবি গার্ডিয়ান ছেপেছিল ৭ অক্টোবর। সিঁদুর তৈরির কারখানায় একটি শিশুর মুখ ছিল সে ছবিতে। কারখানাটি ঢাকার। গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি দ্য টেলিগ্রাফ তাঁর একটি ছবি ‘পিকচার্স অব দ্য ডে’তে প্রকাশ করে। সেটির বিষয় ছিল, ঢাকায় চীনা সাংস্কৃতিক দলের পরিবেশনা। ২১ নভেম্বর ২০১৪ সালে সিএনএন তাঁর যে ছবিটি প্রকাশ করে, সেটির বিষয় ছিল বিশ্রাম। কালীগঙ্গা নদীর তীরে ভিড়ে আছে একটি নৌকা, তাতে শুয়ে আছেন মাঝি।     

 

একজন জাকির

১৯৮১ সালের ১৫ এপ্রিল ফেনী সদরের শর্শদী ইউনিয়নের উত্তর শর্শদী গ্রামের সাহেববাড়িতে জন্ম জাকির হোসেন চৌধুরীর। শৈশব ও কৈশোর কাটে সেখানেই। বাবা আমিনুর রহমান চৌধুরী কাজ করতেন ঢাকার পাইওনিয়ার প্রিন্টিং প্রেসে। পাঁচ বোন এক ভাইয়ের মধ্যে জাকির সবার বড়। ছেলের ওপর মায়ের ছিল কড়া নজর। স্কুল আর বাসা—এই ছিল জাকিরের গণ্ডি। বই পড়ার নেশা ছিল খুব। ক্রিকেটও খেলতেন। তবে বাড়ির পাশের ধানক্ষেতে। বাড়ির কাছের বিশাল দিঘিটি তাঁর ভালো লাগত। ফেনী সরকারি কলেজ থেকে ২০০২ সালে ডিগ্রি পাস করে ঢাকায় আসেন জাকির। হাবীবুল্লাহ্ বাহার কলেজ থেকে ২০০৫ সালে মাস্টার্স শেষ করেন।

 

মামা ও ক্যামেরা

১৯৯৮ সালের ঘটনা। মামা মশিউর রহমান কিরণ কুয়েত থেকে দেশে আসেন। সঙ্গে আনেন ইয়াসিকার একটি ফিল্ম ক্যামেরা। তিনি আত্মীয়স্বজন সবাইকে দাঁড় করিয়ে ছবি তুলতেন বিদেশে নিয়ে সেগুলো দেখবেন বলে। জাকিরেরও সাধ হলো ছবি তোলার। মামাকে দেখে দেখে ফিল্ম ভরা, খোলা ও ছবি তোলার কৌশল শিখলেন। তিন মাস পর মামা চলে গেলেন কুয়েত, উপহার দিয়ে গেলেন ক্যামেরা। প্রথম প্রথম জাকিরও পরিবারের লোকজনের ছবি তুলতেন। এই যেমন উঠানে তিন বোন বা দিঘির পাড়ে বড়দি ইত্যাদি। প্রথম ফিল্মটি শেষ হলো ১৫ দিনে।   পরেরটির জন্য অপেক্ষা করতে হলো দুই মাস। টিফিনের টাকা জমিয়ে ২০০ টাকা দিয়ে কিনেছিলেন সেটি। শর্শদী বাজারের কনিকা কালার ল্যাব ও স্টুডিওতে গিয়ে ছবি ধোয়াতেন। তখন শর্শদীতে ক্যামেরা কেবল তাঁরই ছিল। মানুষজন তাঁকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখত। ভালো লাগত জাকিরের।  

 

ইশ ক্যামেরাটি নষ্ট হয়ে গেল

সেটি ২০০৪ সাল। ইয়াসিকা ক্যামেরাটি নষ্ট হয়ে যায়। মেরামত করতে এক হাজার টাকা লাগবে। থেমে গেল ছবি তোলা। তবে স্থির করলেন, সুযোগ পেলে নিজের টাকায় ক্যামেরা কিনবেন।

 

ক্যামেরার জন্য   

মাস্টার্স পরীক্ষার পর কোথাও ভালো চাকরি পাচ্ছিলেন না। ২০০৪ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অফিস এক্সিকিউটিভের চাকরি পান। বেতন সাড়ে চার হাজার টাকা। দিন যায়, টাকা জমে না। ক্যামেরা থেকে যায় অধরা! তবে একদিন সুদিন আসে। তিনি আর্টিসান সিরামিকসে ১১ হাজার টাকা বেতনের চাকরি পান। তারপর থেকেই টাকা জমানো শুরু  করলেন। ২০০৭ সালে অফিসের সহকর্মী মুকুল খানের একটি ডিজিটাল ক্যামেরা ছিল। তাঁর কাছে ক্যামেরার পরামর্শ চাইলেন। জানালেন, তিনি একটি ক্যামেরা কিনবেন, টাকা জমাচ্ছেন। মুকুল জানালেন, তাঁর এক বন্ধু সিঙ্গাপুর থেকে দেশে আসছে, বললে হয়তো এনে দেবে। জাকিরের কাছে তখন মাত্র ১৫ হাজার টাকা। বাকি টাকার জন্য অফিস থেকে লোন চাইলেন। অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্ট প্রথমে শুনে হাসল। পরামর্শ দিল, ছেলেমানুষি করো না। টাকা জমাও, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। বোনরা আছে বিয়ে দিতে হবে। কিন্তু জাকির গাঁইগুঁই করে লোন নিয়েই ছাড়লেন। মোট ২৬ হাজার টাকায় পাওয়া গেল সনি ডিএসসি-এইচ১০ ডিজিটাল ক্যামেরা। ক্যামেরা পাওয়ার পরই সহকর্মীকে নিয়ে চলে গেলেন বান্দরবান। নীলগিরি, নীলাচল, স্বর্ণমন্দির ঘুরে দেখলেন। তুললেন আকাশ, মেঘ আর সবুজের ছবি। তখন ফ্রেম সেন্স পরিষ্কার হয়নি জাকিরের। ২০০৭ সাল থেকে ফেসবুকে আপলোড দেওয়া শুরু করলেন। বন্ধুরা দেখে নানা পরামর্শ দিতেন।

এলো ২০০৮

ফ্লিকারে ছবি রাখা শুরু করেন। অনেক পরামর্শ পাচ্ছিলেন। সেগুলো সিরিয়াসলি নিয়ে একই ছবি আবার তুলতে যেতেন এবং কোনো কোনো ছবি তুলেছেন অনেকবার। সাপ্তাহিক বন্ধের দিনগুলোয় ঘুরে বেড়াতেন আর ছবি তুলতেন। ইন্টারনেটে বিভিন্ন ফটোগ্রাফির ওয়েবসাইট দেখতেন। ভালো সব ছবি নিজের কম্পিউটারে রাখতেন আর বারবার দেখতেন। একপর্যায়ে মানুষের ছবি তোলা শুরু করেন, বিশেষ করে তাদের আবেগ ও অভিব্যক্তি।

 

চাকরি ছেড়ে দিলেন

ফটোগ্রাফির নেশাটা এমন হলো যে ঘরে বসে থাকতে আর ইচ্ছা হয় না। সপ্তাহের দুই দিনে হবে না, সাত দিনই ছবি তুলতে হবে। ২০১২ সালে অ্যাকাউন্টস ম্যানেজারের চাকরি ছেড়ে দিলেন। অ্যাকাউন্টসপ্রধান এই বয়সে চাকরি ছাড়ার মতো ভুল না করতে বলেছিলেন। বেতনও বাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জাকিরকে ছবিগুলো ডাকছিল। নতুন কেনা ক্যাননের ফাইভ হান্ড্রেড ডি ক্যামেরাটাও বুঝি বলছিল কিছু! তুলনামূলক কম বেতনে যোগ দিলেন আমার দেশ পত্রিকায়। অফিস থেকে পেলেন একটি ফাইভডি মার্ক টু। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে ফ্রিল্যান্স হয়ে গেলেন।

 

মুক্ত জীবন

ইন্টারনেটে আন্তর্জাতিক সংবাদ এজেন্সিগুলোতে ছবি জমা দিতে থাকেন। বিক্রি হলে ৫০ শতাংশ টাকা পেতেন। ২০১৩ সালের অক্টোবরে প্রথম ইতালির নূর এজেন্সিতে যোগ দেন। তিন মাস পর পর ১৫০ থেকে ২০০ পাউন্ড পেতেন। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকার জুমা প্রেসে যোগ দেন। সেখান থেকে প্রতি মাসে ২০০ ডলারের মতো পেতেন। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ফটোগ্রাফির ওপর প্রথম একাডেমিক কোর্স করেন। এক বছরের ডিপ্লোমা। ২০১৫ সালে তুরস্কের এনাডুলা এজেন্সিতে যোগ দেন। সেখান থেকে অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে এখন কাজ করেন। খরচ বাদে প্রতি অ্যাসাইনমেন্ট ১০০ ডলার। দুর্যোগ, লবণাক্ততা ও জীবনধারা তাঁর কাজের বিষয়। সারা দেশে ঘোরেন। অনেক আনন্দ পান।


মন্তব্য