যশোর জেলার মানচিত্র-332192 | অবসরে | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


অমূল্য রতন

যশোর জেলার মানচিত্র

১৭৮৬ সালে জেলা হিসাবে যশোরের যাত্রা শুরু হয়। ১০০ বছর পরে গঠিত হয় ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড। যশোর জেলা পরিষদ ২০১৩ সালে ১২৭ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তখন স্মরণিকা প্রকাশ করতে গিয়েই খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল প্রথম মানচিত্রটি। ফখরে আলম লিখেছেন বিস্তারিত

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



যশোর জেলার মানচিত্র

শতবর্ষ পূর্তিতে ম্যাপ বাঁধা হবে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। পুরনো লোকদের একত্র করা হবে। আর তখন একটা স্মরণিকা হাতে না ধরিয়ে দিলে কি মান থাকবে? তাই জেলা পরিষদের প্রকৌশলী এস এম নূরুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয় স্মরণিকা প্রকাশের। তিনি কোমর বেঁধে নামলেন। স্টোররুমে ঢুকে দেখেন চামচিকা বাসা বেঁধেছে। তিনি নাকে রুমাল বেঁধে উই খাওয়া কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে হঠাৎই পেয়ে গেলেন মানচিত্র। যশোর জেলার মানচিত্র। ১৭৮১ সালে  ব্রিটিশ সরকার এই মানচিত্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল। এটি তৈরি না হলে উন্নয়নকাজ ব্যাহত হতো, খাজনা আদায়েও সুবিধা করা যেত না। এটি ছিল সেই সময়—যখন বৃহত্তর নদীয়া, চব্বিশ পরগনা, খুলনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর ও পাবনা জেলার বেশির ভাগ যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। মানচিত্রে প্রদেশ, সীমানা, জেলা, মহকুমা, থানা, রেললাইন, মহাকুমা সদর, নদী, বিল, পাকা রাস্তা, কাঁচা রাস্তা, বন্যাকবলিত এলাকা ইত্যাদি চিহ্নিত করা হয়েছে। মানচিত্রটি দেশের আর কোথাও নেই। এর ওপর ভর করে পরে আরো সব মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। যেমন ১৯১৭ সালে অবিভক্ত যশোরের মানচিত্র তৈরি করা হয়। ১৯২১ সালে তৈরি হয়  যশোর-খুলনার মানচিত্র। এরপর ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারতের অংশ বাদ দিয়ে যশোর জেলার মানচিত্র তৈরি করা হয়।

মানচিত্রর সবিস্তার

ওই মানচিত্রে মাগুরা, নড়াইল, যশোরের বিশাল এলাকা বন্যাকবলিত হিসেবে দেখানো হয়েছে। ধারণা করা হয় এই বন্যাকবলিত এলাকার খাজনা মওকুফ ছিল। চিকন রেখার মাধ্যমে রেললাইন চিহ্নিত করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রানাঘাট থেকে রেললাইন চুয়াডাঙ্গার দর্শনা হয়ে গোয়ালন্দ এসেছে। আবার রানাঘাট থেকে আরেকটি লাইন বনগাঁ হয়ে যশোরে এসেছে। মানচিত্রে গোপালগঞ্জকে যশোরের একটি গ্রাম হিসেবে দেখানো হয়েছে। মানচিত্রে অনেক নদী, খাল রয়েছে। যেগুলোর এখন আর অস্তিত্ব নেই।

মানচিত্রে উত্তরে কুষ্টিয়া, উত্তর-পূর্বে গোয়ালন্দ, পূর্বে ফরিদপুর ও মাদারীপুর, দক্ষিণে খুলনা, সাতক্ষীরা, বারাসাত আর পশ্চিমে রানাঘাট, কৃষ্ণনগর ও মেহেরপুরের গ্রামগঞ্জ, নদী-নালা রয়েছে। মানচিত্রটি ‘শতবর্ষী’ স্মরণিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর তোলপাড় হয়। অনেক গবেষক তা সংগ্রহ করেন। বাংলাদেশ আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরের পরিচালক আবদুল বারি চৌধুরী, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ওয়েস্ট বেঙ্গল ডাইরেক্টরেট স্টেট আর্কাইভ ড. সৌমন্তি সেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম মান্নান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন প্রফেসর অনীক মাহমুদ প্রমুখ আছেন এ তালিকায়। 

 

যশোর ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড সবিস্তার

১৮৮৬ সালে ১৬টি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড গঠিত হয়। যশোর বাদে আর ছিল ঢাকা, চব্বিশ পরগনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, খুলনা, হুগলি, হাওড়া, বর্ধমান, মেদিনীপুর, বাকুড়া, বীরভুম, ফদিপুর, পাবনা ও পাটনা। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড প্রতিষ্ঠার পর যোগাযোগব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, পশু চিকিৎস বা সুপেয় পানি ব্যবস্থাপনায় অনেক অগ্রগতি হয়। ১৯৬০ সালে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডকে ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল করা হয়। ১৯৭৬ সালে ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলকে জেলা পরিষদ করা হয়।

একসময় ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যতালিকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। সে সময় ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের পাঠ্যতালিকা অনুযায়ী পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়েছে। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তিও দিয়েছে। টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে ঢাকঢোল পিটিয়ে দেয়ালে দেয়ালে নোটিশ টানিয়ে। ১৯২৩ সালের নভেম্বর মাসে যশোর ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের স্বাস্থ্য বিভাগের এক নোটিশ ছিল এমন—‘এতদ্বারা যশোহর জেলার সর্বসাধারণকে জ্ঞাত করানো হইতেছে যে, বঙ্গীয় গভারমেন্ট অত্র জেলায় ১৮৮০ সালের টিকা বিভাগের আইন প্রচলিত করিয়াছেন। এই আইন মতে, প্রত্যেক পিতা-মাতা ও অভিভাবক শিশুসন্তান জন্মাইবার ছয় মাসের মধ্যে তাহাদিগকে টিকা দেওয়াইয়া লইতে হইবে।

জেলা বোর্ড সর্বসাধারণের সুবিধার জন্য অত্র জেলায় নিম্নলিখিত ২২৫টি স্থানে সাধারণের টিকা লইবার ডিপো (অর্থাৎ বিনা ব্যয়ে টিকা লইবার স্থান) স্থাপন করিয়া প্রতি বৎসর অক্টোবর হইতে পরবর্তী সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সপ্তাহে দুই দিবস টিকা দেওয়াইবার বন্দোবস্ত করিয়াছেন। যে সমস্ত লোক তাহাদের অধীনস্থ বালক-বালিকাদিগকে টিকা দেওয়াইয়া না লইবে, তাহাদের আইনমতে ৫০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হইতে পারিবে।’ সাহিত্য-শিল্পকর্মেও ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুতে যশোর ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড ১৯৪১ সালের ১২ আগস্ট একটি শোক প্রস্তাব গ্রহণ করে। এ কারণে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বার্তা পাঠান।

মন্তব্য