‘রুটি নাই তো কেক খাও’-332186 | অবসরে | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


ভুল সবই ভুল

‘রুটি নাই তো কেক খাও’

সবাই সত্যি জানে, এমন অনেক কথা পরে যাচাই করে দেখা গেছে, সেগুলো মিথ্যা। অবসরে সেগুলো আনতে যাচ্ছে পাঠকের গোচরে। লিখেছেন গাউস রহমান পিয়াস

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘রুটি নাই তো কেক খাও’

 

ফরাসী বিপ্লবের সময়কার ফ্রান্সের রানি মেরি আঁতোয়াঁনেৎ জীবনের শেষ মুহূর্তে কী ভাবছিলেন কে জানে! গিলোটিন মঞ্চে যাওয়ার পথে হঠাৎ জল্লাদের পা মাড়িয়ে দিলেন। সে জন্য ক্ষমাও চাইলেন। ‘আমাকে ক্ষমা করবেন, জনাব। ইচ্ছা করে করিনি।’ তারও আগে ভোরে শেষ চিঠিটি লিখে এসেছেন : ‘১৬ অক্টোবর, ভোর ৪.৩০। হে ইশ্বর, আমাকে ক্ষমা করো। হতভাগা সন্তানদের জন্য আর কী কাঁদব! চোখের জলও যে ফুরিয়ে গেছে। বিদায়, বিদায়!’ যে মানুষটি জীবনের শেষ মুহূর্তেও এমন মমতাময়ী, বহু ফরাসির কাছে তিনি আজও এক ঘৃণ্য নাম। তাদের বিশ্বাস : দুর্ভিক্ষের সময় ফরাসি চাষিরা যখন ক্ষুধায় মরছিল, তাঁর স্বামী রাজা ষোড়শ লুইকে সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়েছিল “ওরা রুটি খেতে পাচ্ছে না।” শুনে তখন নাকি মেরি বলে উঠেছিলেন, ‘কিল মঁজেঁ দ্য লা ব্রিওখ’। তাহলে ওরা কেক খাক। রুটি নাই তো কী!

তবে রানি আঁতোয়াঁনেৎ এমন কথা বলেছিলেন, তার কোনো প্রমান ইতিহাসে নেই। ‘কিল মঁজেঁ দ্য লা ব্রিওখ’ কথাটি প্রথম লেখেন রাজনৈতিক দার্শনিক জঁ জ্যাক রুশো আত্মজীবনী ‘কনফেশনস’, ফরাসি বিপ্লবের অনেককাল আগে। তখন মেরির বয়স ১০ বছর, নিজ দেশ অস্ট্রিয়ায় ছিল তাঁর শিশুর জীবন। আরো চার বছর পর রাজা ষোড়শ লুইয়ের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর আসেন ফ্রান্সে। সত্যি বলতে কী, তাঁর জন্মেরও ১৮ বছর আগে রুশো এক চিঠিতে প্রথম ‘কিল মঁজেঁ দ্য লা ব্রিওখ’ বাক্যটি লেখেন। আর তাঁর আত্মজীবনীতে কথাটি আসে আরেক ‘রাজকুমারী’র জবানিতে। হতে পারে রুশোর নিজ ভাবনা থেকেই কথাটি বলেছিলেন, কিংবা তিনি আসলে মেরি তেরেসের প্রতি ইঙ্গিত করছিলেন।

আসলে বিপ্লবীরা অভিজাত সমাজের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব তৈরির ষড়যন্ত্র থেকে ‘লেট দেম ইট কেক’ কথাটি মেরি আঁতোয়াঁনেতের নামে ছড়িয়ে দেয়। বিপ্লবোত্তর সময়ের ফরাসি ঐতিহাসিকরাও আভিজাত্যের প্রতি ঘৃণা থেকে সত্যি কথাটি বলেননি।

ষড়যন্ত্রটা এমনই ছিল সাবেক রানিকে শোকের কালো গাউনটা পর্যন্ত পরতে দেওয়া হয়নি। কর্তাদের ভয় ছিল, তাঁকে হত্যা করার দৃশ্য কাউকে কাউকে সমব্যাথি করে তুলতে পারে। জনতার মধ্যে রাজপরিবারের পক্ষে কোনো জনমত তৈরি হতে দেওয়া যাবে না! তাই গিলোটিনে যাওয়ার আগে মেরিকে পরানো হয়েছিল সাদা সুতির একটি গাউন। মাথার টুপিটিও ছিল সাদা। ইতিহাসের কোনো কোনো বইয়ে বলা হয়েছে, জনতা সেদিন উল্লাসে ফেটে পড়েছিল। তবে  সত্যিটা হচ্ছে, অক্টোবরের সেই দুপুরে রানি মেরির শান্ত অবিচল মাতৃমূর্তি দেখে নেমে এসেছিল জনতার চোখ। কারো কারো গলায় ধ্বনিত হয়েছিল, ‘মহারানি দীর্ঘজীবী হোন’। তখন ফ্রান্সে ঘড়ির কাঁটা দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট। ১৬ অক্টোবর, ১৭৯৩। আর বাতাসে ভাসতে থাকে খবর : ‘রুটি নাই তো কেক খাকগে’ বলে যে রানি দরিদ্র চাষিদের অবজ্ঞা করেছিলেন তার উপযুক্ত শাস্তি হয়েছে।

মন্তব্য