kalerkantho

আরো আম

   

৩০ মে, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বুক সেলাই

কেউ বলে বার্মাইয়া আম, কেউ বুক সেলাই নামেও ডাকে। আসল নাম রাঙ্গুয়াই। ব্যতিক্রমী আম। জাদুর আমও বলা যায়। এটি একমাত্র আম, যার বীজ থেকে উৎপন্ন চারা মাতৃ গুণাগুণসম্পন্ন হয়। তিন বছরের মধ্যেই সেই চারায় ফল ধরে। এমনকি প্রতিবছর ফল হয়। প্রতিটি আমের বুক ফাড়া। এ জন্য এই আম বুক সেলাই নামেও পরিচিত। এটি মিয়ানমারের জনপ্রিয় আম। সীমান্ত গলিয়ে এই আম বাংলাদেশে এসেছে। এখন কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলার ব্যাপক জমিতে রাঙ্গুয়াই আম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ হচ্ছে।

ছয় বছর আগে এই আমের খবর যশোর শহরের চাঁচড়া ডালমিল এলাকার নাসিমা আলম জানতে পারেন। তিনি বান্দরবানের একজন সাংবাদিকের সহায়তায় কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে রাঙ্গুয়াই আমের একটি আঁটি সংগ্রহ করেন। আমের সঙ্গে আরো সংগ্রহ করেন চারা তৈরির পরামর্শপত্র। পরামর্শমতো আঁটিটি ২৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখেন। পরে আঁটি খুলে ভেতরে বাদামের মতো কয়েকটি বীজ পান। সেই বীজ থেকে তিনটি চারা হয়। দুটিমারা গেছে। একটি চারা টবে রোপণ করেন। তিন বছরের মাথায় গাছটিতে আম ধরে। আম লম্বাটে। মাঝারি আকৃতির। ফজলি আমের মতো মিষ্টি। আঁটি সরু। এই আম মৌসুমের শেষে পাকে। সংরক্ষণশীলতাও ভালো। গাছ ছোট হয়। প্রচুর আম ধরে। টবেও চাষ করা যায়। বান্দরবান জেলার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক আবুল কালাম বলেন, 'এই আম জেলা সদর, রুমা, পাঞ্চিসহ আরো কয়েকটি পাহাড়ে চাষ হচ্ছে। মিয়ানমার থেকেই এই আম আমাদের দেশে এসেছে।' রাঙামাটির লংগদু হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ আবদুস সামাদ বলেন, 'পলিয়াম ব্রাইও প্রজাতির রাঙ্গুয়াই আমের একটি আঁটি থেকে কয়েকটি চারা হয়। এর গাছ বামন আকৃতির। প্রতিবছর ফলন হয়। ফজলি আমের মতো মিষ্টি। বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ করা যায়। বীজের চারা থেকে তিন বছরের মধ্যেই ফল আসে বলে আমটি অনেকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। রাঙামাটির বিভিন্ন জায়গায় এই আমের চাষ হচ্ছে। এর পোকা আক্রমণের প্রতিরোধ ক্ষমতাও ভালো। মিয়ানমারের এই আম দেশের পার্বত্য এলাকায় এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে জায়গা দখল করে নিয়েছে।'

ব্যানানা ম্যাংগো

একেবারে কলার মতো আম। দূর থেকে দেখে মনে হবে আমগাছে সাগর কলা ঝুলছে। তবে ব্যানানা ম্যাংগো গায়ে-গতরে মোটা। পাকলে সাগর কলার রূপ ধারণ করে। কলার রঙে নিজেকে রাঙিয়ে অনেকের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। দেশের বিভিন্ন উদ্যানকেন্দ্র ও সৌখিন আমচাষিদের বাগানে এখন ব্যানানা ম্যাংগো শোভা পাচ্ছে। আর অভিনব এই আম দেখার জন্য অনেকেই গাছের সামনে দাঁড়িয়ে থাকছে। মাগুরা উদ্যানকেন্দ্রের তিনটি গাছে ব্যানানা ম্যাংগো ধরেছে। অনেকে এই আমের ছবি তুলছে। আমটি দেখতে যেমন বাহারি, খেতেও ভালো। পাতলা খোসা। চিকন আঁটি। মিষ্টতার পরিমাণ ২০ শতাংশ। সাধারণ আম এক বছর ধরে, এক বছর ধরে না। কিন্তু ব্যানানা ম্যাংগো প্রতিবছরই ধরে। ফলনও হয় খুব। মাগুরা উদ্যানকেন্দ্রের ছোট ছোট তিনটি গাছে প্রতিটিতে ২০-২৫টি করে আম ধরেছে। এই আম একেবারে মৌসুমের শেষে পাকে। ইংল্যান্ড-আমেরিকায় এর খুবই কদর। অনেক দামে বিক্রি হয়। কিন্তু আমটি এ দেশের নতুন অতিথি। থাইল্যান্ড থেকে বিমানে চেপে ব্যানানা ম্যাংগো বাংলাদেশে এসেছে। ১০-১২ বছর আগে প্রথম এই আমের চারা নিয়ে আসেন উদ্যানতত্ত্ববিদ সঞ্জয় কুমার কয়েলদার। এরপর কৃষিবিদ এস এম কামরুজ্জামান থাইল্যান্ড থেকে ব্যানানা ম্যাংগোর বেশ কিছু চারা নিয়ে আসেন। বংশ বিস্তার করে বিভিন্ন উদ্যানকেন্দ্রের মাধ্যমে তিনি মাঠ পর্যায়ের আগ্রহী কৃষকদের মাধ্যমে ব্যানানা ম্যাংগো ছড়িয়ে দেন। কামরুজ্জামান বলেন, 'বসতবাড়ির আঙিনায় বাহারি এই আমের চারা রোপণের জন্য আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। আন্তর্জাতিক বাজারে এই আমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ জন্য বাণিজ্যিক চাষের মাধ্যমে ব্যানানা ম্যাংগো ভাগ্য বদলের হাতিয়ার হতে পারে।'

ডায়াবেটিক আম

ল্যাংড়া আমের মিষ্টতার পরিমাণ ১৯ শতাংশ। আম্রপালির মিষ্টতার পরিমাণ ২৩ শতাংশ। কিন্তু ডায়াবেটিক আমের মিষ্টতার পরিমাণ শূন্য শতাংশ। অর্থাৎ জিরো সুগারের আমই হচ্ছে ডায়াবেটিক আম। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহের জার্মপ্লাজম সেন্টার ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য এই আম উদ্ভাবন করেছে। এফটিআইপির প্রকল্প পরিচালক প্রফেসর ড. আবদুর রহিম দীর্ঘ গবেষণার পর ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য ডায়াবেটিক আম উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশের বাউকুলের জনক ড. রহিম ৯টি আম নিয়ে গবেষণার পর একটি আমে জিরো সুগার পেয়েছেন। অর্থাৎ ওই আমে কোনো মিষ্টি নেই। ড. আবদুর রহিম জানান, ডায়াবেটিক রোগীদের আম খেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সুগার বেড়ে যাওয়ার ভয়ে তারা আম খেতে পারে না। এ কারণে ডায়াবেটিক রোগীদের কথা বিবেচনা করে ডায়াবেটিক আম উদ্ভাবন করা হয়েছে।

আম চাষে আম গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভূমিকা

১৯৮৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করা হয় আম গবেষণা ইনস্টিটিউট। এর বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ গবেষণা চালিয়ে আটটি উন্নত জাতের আম উদ্ভাবন করেছেন। এগুলো হচ্ছে, বারি-১, বারি-২, বারি-৩, বারি-৪, বারি-৫, বারি-৬, বারি-৮ ও বারি-৯। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সহযোগিতায় উদ্ভাবিত এই আমের চারা কৃষক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব আমের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, নিয়মিত ফল পাওয়া যাবে। আমের রং উজ্জ্বল। মৌসুমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গাছে আম থাকবে। আমগুলো রপ্তানিযোগ্য। বিজ্ঞানীরা জানান, 'নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য আমরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছি। অনেকেই এখন আগ্রহী হয়ে আমচাষ করছেন। আমচাষ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বেশ লাভজনক। দেশে আমচাষের অপার সম্ভাবনা রয়েছে।'

 

 

মন্তব্য