kalerkantho

ট্রিনিটি কলেজে বায়ুদূষণ নিয়ে কাজ করছেন সানিউল

ফাহমিদা হক   

৩০ মে, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ট্রিনিটি কলেজে বায়ুদূষণ নিয়ে কাজ করছেন সানিউল

মেয়ের সঙ্গে সানিউল

আয়ারল্যান্ডের ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য গবেষণা করছেন মো. সানিউল আলম। সেখানকার সিভিল, স্ট্রাকচারাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ছাত্র হিসেবে পড়াশোনা করছেন তিনি। তাঁর গবেষণার বিষয়-রাস্তাঘাটে গাড়ি চলাচলের দরুন নির্গত গ্যাস থেকে যে বায়ুদূষণ হয়, তার মাত্রা নির্ধারণ এবং তা নিরাময়ের উদ্দেশ্যে বিকল্প কোনো পথ খুঁজে বের করা। আয়ারল্যান্ডের 'ইমিশন অ্যান্ড এক্সপোজার মডেলিং অ্যান্ড ইমপ্যাক্ট অ্যানালিসিস ফর স্মার্টার ট্রাভেল' নামের প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আছেন সানিউল। তাঁর এই গবেষণা মূলত এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সির পরিবেশবিষয়ক নানা প্রকল্পের একটি।

রাস্তাঘাটে গাড়ি থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাসের জন্য আমরা সবাই কমবেশি ভুক্তভোগী। ঢাকা শহরে এ সমস্যা আরো অনেক বেশি মাত্রায় প্রকট। শহরে বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে গাড়ি থেকে নির্গত গ্যাসই সব চেয়ে বেশি দায়ী। আর তাই কোনো শহরে মোট জনসংখ্যা আর গাড়ির পরিপ্রেক্ষিতে মোট কতটুকু গ্রিনহাউস গ্যাস বা জিএইচজি নির্গত হচ্ছে বা ভবিষ্যতে হবে, তা ঠিকমতো জানা থাকলে এর সমাধানও বের করা সম্ভব।

দূষিত বায়ুতে সব চেয়ে মারাত্মক যে উপাদানটি থাকে, সেটি হলো পার্টিকুলেট মেটার বা পিএম। ক্ষুদ্র এ কণাগুলো আমাদের শ্বাসের সঙ্গে শ্বাসনালিতে প্রবেশের মাধ্যমে ফুসফুস ও শ্বাসনালির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। সানিউলের গবেষণায় এই পিএম কণা নিয়ে অনেক কাজ রয়েছে। তিনি বিভিন্ন পরিসংখ্যানের সাহায্য নিয়ে কোনো শহরে রোজকার মোট পার্টিকুলেট মেটারের পরিমাণ বের করার জন্য একটি মডেল দাঁড় করিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা আর আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহর নিয়ে তিনি কাজ করলেও অন্য শহরগুলোতেও তাঁর মডেল ব্যবহার করে এমনিভাবে পার্টিকুলেট মেটারের পরিমাণ বের করা সম্ভব। এ বিষয়ে তাঁর সুপারভাইজর ড. আওনঘুস ম্যাকনাবোলার সঙ্গে একটি গবেষণাপত্রও বের হয় এ বছরের শুরুর দিকে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধীনে 'ইকোনাভ' নামের একটি প্রকল্পেও কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে সানিউলের। আমরা সবাই জানি যে গ্রামের তুলনায় শহর এলাকার বাতাসে বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস থাকে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো শহর এলাকায় গ্রামের চেয়ে অনেক বেশি গাড়ি চলাচল করে। তার ওপর এখনকার সময়ে সব উন্নত শহরে সরকারি গাড়ির চেয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের চল অনেক বেশি। এসব গাড়ি ব্যবহারকারীরা যদি বায়ুদূষণ রোধে একটু সচেতন হন, আর সেই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব উপায়ে গাড়ি চালাতে সচেষ্ট হন, তাহলে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের মাত্রা অনেকটুকু কমানো সম্ভব। 'ইকোনাভ' প্রকল্পে মূলত শহরে যাতায়াত করা এসব মানুষের মাঝে বায়ুদূষণ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো নিয়ে কাজ করা হয়। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত হওয়া এ প্রকল্পে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীদের জিপিএস এবং নিউরাল নেটওয়ার্কের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়, যাতে এর দরুন সম্ভাব্য কার্বন নির্গমনের তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়।

তবে পরিবেশবান্ধব উপায়ে গাড়ি চালালেই যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে তা কিন্তু নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশবান্ধব গাড়ি চালানোর জন্য জ্বালানির অপচয় ও কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের নির্গমন-এ দুটিই ৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। তবে অনেক সময়ই মাত্রাতিরিক্ত জ্যামে এই পরিমাণের যথেষ্টই হেরফের হতে পারে। আবার পরিবেশবান্ধব গাড়ি ব্যবহারের দিকটি উৎসাহিত করতে গিয়ে দুর্ঘটনার ব্যাপারটা প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। সুতরাং একটা সফল যাতায়াতব্যবস্থা যে আসলে এসব কিছুরই সমন্বয়, সে দিকটাও উঠে এসেছে সানিউলের গবেষণায়।

এসব গবেষণার পাশাপাশি সানিউল আয়ারল্যান্ডে বহুল প্রচলিত ডিজেলচালিত গাড়ির দরুন কিভাবে বায়ুদূষণ বেশি হতে পারে, সে ব্যাপারেও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গমনের জন্য ডিজেলচালিত গাড়ি অন্যতম উৎস। আর তাই এ ধরনের গাড়ির চলাচল বন্ধ না করলে পরিবেশবান্ধব যাতায়াতব্যবস্থা নিশ্চিত করা যে কিছুতেই সম্ভব না, সেটাও সানিউলের গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। সানিউলের গবেষণা কার্যত আয়ারল্যান্ড ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে সম্পন্ন হলেও আমাদের দেশে প্রচলিত যাতায়াতব্যবস্থা আর এ থেকে উৎপন্ন ভয়ানক বায়ুদূষণের দারুণ এক সমাধান হতে পারে। তাঁর গবেষণায় যেমন বাতাসে দূষণের মাত্রা নির্ণয়ের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে বিভিন্নভাবে, তেমনি আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করে বায়ুদূষণ রোধে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে তা কত দিনে আর কিভাবে হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

 

 

মন্তব্য