kalerkantho

মৌয়াল ঢালী

দশ বছর বয়সে প্রথম মধু কাটতে গিয়েছিলেন। এখন আব্দুল    

৩০ মে, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মৌয়াল ঢালী

এগারোজন ভাই-বোনের মধ্যে সে পঞ্চম। বাবার নাম ধনাই ঢালী। সেবার বয়স যখন দশ, আজিজকে সঙ্গে নিয়েছিলেন বাবা। বলেছিলেন, চল বাদাই যাই। তখন পঞ্চাশের মন্বন্তর। খুব অভাব। বাড়ি তাদের সুন্দরবনের বুড়িগোয়ালিনী। আর বাদা মানে কলাগাছিয়া মানে গহিন বন। বাড়ি থেকে তিন ঘণ্টা নৌকা চালালে তবে পৌঁছানো যায় কলাগাছিয়া। ১৫ দিনের চাল নিয়ে বেরিয়েছিল দুই নৌকায়। একটায় বাবা আর ছেলে, অন্যটায় চাচা আর চাচাতো ভাই। বিহান বেলায় তারা নৌকা ভাসিয়েছিল। সূর্য মাথায় ওঠার আগেই ঢুকে গিয়েছিল বনে। বাবার নেতৃত্বে ছোট্ট একটা মৌচাকে তারা ধোঁয়া দিয়েছিল। মধু দিয়েই সেদিনের দুপুরের খাবার সেরেছিল। বিকেলে কাঠ কাটতে গিয়ে বাবার হাত কেটে গিয়েছিল। রক্ত কিছুতেই থামছিল না। তাই পরের দিন বাবা বাড়ি ফিরে গিয়ে আরেকটা লোক পাঠিয়ে দেন। আজিজ বুঝে গিয়েছিল, নিজেদের ভাগের কাঠের দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে। ১৫ দিনে তারা কাঠ কেটেছিল সাড়ে পাঁচ মণ। বুড়িগোয়ালিনী ফিরে কাঠ গুছিয়ে নিয়ে রওনা হয়েছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি। সেই কাঠ বিক্রি করেছিল নব্বই টাকায়। আজিজ কিছুদিন স্কুলেও গিয়েছিল। তখন স্কুল মানে পাঠশালা। কিন্তু দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে বাবার সঙ্গে বনে যেতে হলো। নইলে নোয়াখালী বা বরিশাল চলে যেতে হতো। এর বন্দোবস্ত করছিলেন খ্রিস্টান মিশনারিরা। তাঁরা বনবাসী ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিচ্ছিলেন। কিন্তু অভাবের কারণে আজিজের যাওয়া হয়নি। ডাঙায় পাঁচ দিন থেকে আজিজ আবার বাদায় যায়। মৌসুমে মধু কাটে। অমৌসুমে মাছ ধরে, গোলপাতা কাটে, ঝিনুক তোলে, কাঠ কাটে। জঙ্গলের সব কাজই করেছেন আজিজ ঢালী এই ৭৩ বছরের জীবনে। তবে এখন তিনি মধু সংগ্রহ করেন বেশি। ঢাকার বেঙ্গল ট্যুরস ফি বছর মৌসুমের শুরু মানে মে মাসের গোড়ায় যে 'হানি কালেকশন ট্যুর' করে তার নেতৃত্ব দেন আজিজ ঢালী। ঢালী চাচা ১৪ বা ১৫ বছর বয়সেই মধু সংগ্রহের সাজুনি। দলে সাধারণত সাত-আটজন লোক থাকে। বাদায় নেমে একজন নদীর কিছু ওপরে থাকে। মাঝির কাছে থাকে একটি শিঙ্গা। এই শিঙ্গা দিয়ে সে উপস্থিতি জানান দেয়। সাজুনি মানে দলনেতা, তিনি অন্যদের নিয়ে জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেতরে ঢুকে পড়েন। সাজুনির প্রধান কাজ গন্ধ শোঁকা মানে মৌচাক খুঁজে বের করা। পাতায় বা ফুলে দাগ দেখেও আজিজ ঢালী মৌচাকের দিক বুঝতে পারেন। তাঁর আরেকটি কাজ হলো 'পরি' দেওয়া। পরি অর্থ পাহারা। যখন দলের অন্যরা ধামায় মধু ভরে বা ধোঁয়া দেয় বা গাছে উঠে মধু কাটে, সাজুনি তখন সতর্ক দৃষ্টি রাখে চারপাশে। ভয়টা বেশি বাঘের। ডাকাতের ভয়ও আছে।

ঢালী চাচার ৯ ছেলেমেয়ে। তার মধ্যে বড় তিন ছেলে মারা গেছে। একেবারে বড়টা গেছে বাঘের পেটে। তখন ২০০৮ সাল। হরিখালীতে গিয়েছিল মধু কাটতে। আর ফেরেনি। দ্বিতীয় ছেলে মারা গেছে ডাকাতের গুলিতে। ২০০৫ সালে রায়মঙ্গলে। ঢালী চাচা বললেন, আটের দশকে একেক মৌসুমে মধু পাওয়া যেত ৪০-৫০ টিন। এক টিন মানে ২৫ কেজি। এখন অতটা মেলে না। আর জঙ্গলও চাচার আগের মতো ভালো লাগে না। ডাকাতের ভয় খুব। চুপে চুপে মাছ ধরেন বা ঝিনুক তোলেন। তিনি আগে আবাদও করতেন। বিশেষ করে ধানের। এখন জমি নেই। চিংড়ি ঘেরের বদৌলতে সব জায়গা নোনা। অনেক দিন ধরেই তিনি বেঙ্গল ট্যুরসের হানি ট্যুরের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একজন বিদেশি মহিলা নাম বোধকরি গারট্রুড বহুবার এসেছেন। এর বয়সও অনেক। তিনি এসে ছবি তোলেন। কিছুদিন আগে জাপানিরা তাঁর মধু কাটার দৃশ্য ভিডিও করেছে। এখন তাঁকে মাঝেমধ্যে টেলিভিশনে দেখা যায়। নিজেও অনেকবার বাঘের মুখে পড়েছিলেন। একবার দোবেকীতে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। তবে বাঘও সুন্দরবনে ভালো নেই। ডাকাতরা বাঘ মারছে, হরিণ মারছে। একটা বাঘের চামড়া দুই থেকে তিন লাখ টাকায় বিক্রি হয়। চাচার ভালো লাগে সুন্দরবনের কাইম মাগুর। পোলাও পেলে খুশি হন। নামাজ পড়তে ভালো লাগে তাঁর। একবারই কেবল একটা সিনেমা দেখেছেন তাও অর্ধেক। নাম মনে করতে পারেন না। পাঞ্জাবিই পরেন সারা বছর। তাঁর ছোট ছেলে বুড়িগোয়ালিনী হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছে। মেয়েদের সবাইকে বিয়ে দিয়েছেন। তিনি বনের পূর্ব থেকে পশ্চিম সব জায়গাই ঘুরেছেন। তাঁর পছন্দের জায়গা মান্দারবাড়ী।

মন্তব্য