kalerkantho


যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি অধ্যাপক জামালের বহিষ্কারাদেশ স্থগিত

সাবেদ সাথী, নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০৫:২৪



যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি অধ্যাপক জামালের বহিষ্কারাদেশ স্থগিত

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি রসায়নবিদ (বিজ্ঞানী) অধ্যাপক সৈয়দ আহমেদ জামালের বহিষ্কারাদেশ স্থগিত করেছে মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক দপ্তরের (আইসিই)। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ওই স্থগিতাদেশ বাতিল চেয়ে এ বিষয়ে শুনানির আবেদন করা হয় ফলে স্থগিতাদেশের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে পারবেন তিনি।

ক্যানসাস অঙ্গরাজ্যের লওরেন্সের বাসিন্দা রসায়নের অধ্যাপক সৈয়দ আহমেদ জামালকে (৫৪) কে গত ২৪ জানুয়ারি বুধবার সকালে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে বাড়ির সামনেই অবস্থানরত অভিবাসন ও শুল্ক দপ্তরের (আইসিই)-এর কর্মকর্তারা তাকে গ্রেপ্তার করেন। তাঁর গ্রেপ্তারের এ ঘটনায় ক্যানসাসসহ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীদের মাঝে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

সৈয়দ আহমেদ জামালের প্রতিনিধিত্বকারী আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান শর্মা-ক্রফোর্ড এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রণালয় অধ্যাপক জামালকে দেশে ফেরত যাওয়ার আদেশের বিরুদ্ধে আবেদন করেছে। তারা মনে করে যে আদেশটি যথার্থ এবং বাংলাদেশে ফিরে গেলে জামালের কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হবে না।’

অধ্যাপক জামালকে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি পর্যালোচনায় আদালতের ঠিক কত দিন লাগবে, তা জানা যায়নি। তবে আগামী কিছুদিনের মধ্যেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এর মধ্যে, অধ্যাপক জামালের পরিবার তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, সৈয়দ জামালকে শুক্রবারের ভেতরেই দেশে ফেরত পাঠানো হবে। তার আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ীও তাকে বিমানবন্দরের কাছে একটি ডিটেনশন সেন্টারেও রাখা হয়েছিল। ফলে তার দেশে ফেরত যাওয়ার আদেশ স্থগিত হওয়াটা তার পরিবারের জন্য খানিকটা বিস্ময় হয়েই এসেছে।

এর আগে, দুই সপ্তাহ আগে অধ্যাপক জামালকে তার বাসার সামনে থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন তিনি মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিতে সবেমাত্র বাসা থেকে বের হচ্ছিলেন। এ সময় ঘর থেকে স্ত্রী-সন্তানরা বেরিয়ে এলেও তাদের সঙ্গে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই অভিবাসন কর্মকর্তারা তাকে হাতকড়া পরিয়ে ধরে নিয়ে যান। এ ঘটনায় স্থানীয়রা অধ্যাপক জামালের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন গড়ে তোলেন। তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর আদেশ বাতিলের দাবিতে এরই মধ্যে চেঞ্জ ডট অর্গ ওয়েবসাইটে এক অনলাইন পিটিশনে ৬৭ হাজার ব্যক্তি স্বাক্ষরও করেছেন।

অধ্যাপক জামালকে সমর্থন জানিয়ে মিসৌরির কংগ্রেস সদস্য ইমানুয়েল ক্লিভার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে একটি চিঠিও লিখেছেন। ওই চিঠিতে অধ্যাপক জামালকে পুলিশি হেফাজত থেকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। ক্লিভার লিখেছেন, অধ্যাপক জামালকে যেন পরিবারের সঙ্গে দেখা করার ও আদালতে হাজির হতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

ক্লিভার চিঠিতে লিখেছেন, ‘অধ্যাপক জামালকে দেশে ফেরত পাঠানো হলে তাকে পরিবার ছেড়ে চলে যেতে হবে। শুধু তাই নয়, নিজের বিশ্বাসগত অবস্থানের কারণে মাতৃভূমিতেই তিনি উগ্রপন্থীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হতে পারেন, এমনকি তার মৃত্যুও হতে পারে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনি প্রচারণার সময় অপরাধের সঙ্গে জড়িত অনিবন্ধিত অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যাদের অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার নজির আছে, কেবল তাদের ক্ষেত্রেই তার এই কঠোর অবস্থান প্রযোজ্য হবে। তবে সম্প্রতি দেখা গেছে, অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয়— এমন অনেক অনিবন্ধিত অভিবাসীকেও দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

সৈয়দ জামালের আইনজীবী রেখা বলেন, ‘অভিবাসন নিয়ে যে বিভাজনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তারই ফল হিসেবে এমন আরও একটি ঘটনা দুঃস্বপ্ন হিসেবে হাজির হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা এমন বার্তায় ছড়িয়ে দেয় যে, অভিবাসী মাত্রই অপরাধী এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।’

১৯৮৭ সালে শিক্ষার্থী ভিসায় কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন সৈয়দ আহমেদ জামাল। তিনি মলিক্যুলার বায়োসায়েন্স ও ফার্মাসিউটিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি অত্যন্ত দক্ষ কর্মীদের জন্য প্রযোজ্য এইচ-১ বি ভিসায় চিলড্রেন্স মার্সি হাসপাতালে কাজ করেন। পরে পিএইচডি করার জন্য তিনি আবার শিক্ষার্থী ভিসা গ্রহণ করেন।

অধ্যাপক জামালের প্রত্যাবাসনের আদেশ স্থগিত চেয়ে পিটিশন দায়ের করা অভিবাসন আইনজীবী জেফরি ওয়াই বেনেট বলেন, ২০১১ সালের দিকে অধ্যাপক জামাল তার ভিসার বৈধতা হারান। ওই সময় আদালত তাকে ‘স্বেচ্ছায় দেশে ফেরত যাওয়ার’ আদেশ দেন। তবে ওবামা সরকারের নেওয়া ‘প্রসিকিউটোরিয়াল ডিসক্রিশন’ নীতির অধীনে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে কাজ করার অস্থায়ী অনুমতি (টেম্পোরারি ওয়ার্ক পারমিট) দেওয়া হয়। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত ছিল, প্রতিবছর তাকে অভিবাসন কর্মকর্তাদের কাছে হাজিরা দিতে হবে।

অধ্যাপক জামালকে গ্রেপ্তারের সময় তিনি টেম্পোরারি ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কানসাসের পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। একইসঙ্গে স্থানীয় কয়েকটি হাসপাতালে গবেষণা কাজেও সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন অভিবাসননীতিতে নজরদারিতে থাকার ওই নিয়মে দেশটিতে বসবাসরত অভিবাসীদের ওপর খড়গহস্ত হন। ২৫ লাখ মার্কিন অভিবাসী এ শ্রেনীতে পড়েন। তাদের ৮০ শতাংশ কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই।

উল্লেখ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির ফাঁদে পড়া তিনিই প্রথম উচ্চপদস্থ একজন বাংলাদেশি কর্মকর্তা। সৈয়দ আহমেদ জামাল বাংলাদেশি ৩০ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। তার তিন ছেলে-মেয়ের সবাই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তার স্ত্রীও চলৎশক্তিহীন। ফলে অধ্যাপক জামালই তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার পাঁচ ভাইবোনের সবাই যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।



মন্তব্য