kalerkantho


খালেদা জিয়ার মামলার রায়

যুক্তরাষ্ট্রে আওয়ামী লীগে আনন্দ, বিএনপিতে বেদনা

সাবেদ সাথী, নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি   

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০২:১০



যুক্তরাষ্ট্রে আওয়ামী লীগে আনন্দ, বিএনপিতে বেদনা

ছবি: কালের কণ্ঠ

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় অভিযুক্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায়ের খবর শুনতে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতা-কর্মীরা। যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে রায়ের খবর শোনার জন্য বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় কিংবা বাড়ির লিভিং রুমে দলবেঁধে টিভির সামনে বসেন উৎসাহী ও আগ্রহী কর্মীরা।

ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামান বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ২৯ মিনিটে যখন এ রায় ঘোষণা করেন তখন নিউ ইয়র্কের সময় রাত ১টা ২৯ মিনিট। খালেদা জিয়ার ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং তার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ বাকি পাঁচজনকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড খবর শোনার পরই আওয়ামী লীগের কর্মীরা আনন্দ উল্লাসে ফেটে পড়েন। পাশাপাশি ক্ষোভ আর বেদনায় ভেঙে পড়েন বিএনপির নেতা-কর্মীরা।

নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস, ব্রঙ্কস, ব্রুকলিন, ম্যানহাটন ও জামাইকার বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় টিভি দেখার জন্য আওয়ামী লীগ-বিএনপি পাশাপাশি অবস্থানে বসে পড়েন। মামলার রায় ঘোষণার আগে ও পড়ে চরম উত্তেজনা দেখা দেয় উভয় নেতা-কর্মীদের মাঝে। ভেঙে পরা বিএনপির নেতা-কর্মীদের সামলে আওয়ামী লীগ কর্মীদের আনন্দ উল্লাসের ফলে উভয়ে মধ্যে দফায় দফায় উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়সহ গালাগালির ঘটনাও ঘটে তবে তেমন কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

টিভির সামনে দলবেঁধে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায়ের খবর দেখেছেন বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নেতা-কর্মীরাও। নিউ ইয়র্কের বাইরে ম্যাসাচুসেটস, কানেকটিকাট, নিউ জার্সি, পেনসিলভানিয়া, ভার্জিনিয়া, ম্যারিল্যান্ড, জর্জিয়া, ফ্লোরিডা, মিশিগান, শিকাগো, ওহাইও, টেক্সাস ও ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন এলাকায় শতশত প্রবাসী বাংলাদেশিরা নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

উল্লেখ্য, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে এ মামলার অপর আসামি তার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ বাকি পাঁচ জনকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তাদের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা জরিমানাও করা হয়েছে।  

বিচারক জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে ৪০৯ ও ১০৯ ধারার অপরাধ প্রমাণ হয়েছে। ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামান দুপুর ২টা ২৯ মিনিটে এ রায় দেন। এর আগে বেলা সোয়া ২টার দিকে আদালত হাজির হন খালেদা জিয়া। এ সময় তার সঙ্গে বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। রায় শোনার পর আদালতে উপস্থিত খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা হট্টগোল শুরু করেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় কুয়েত থেকে এতিমদের জন্য পাঠানো দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়। ২০০৮ সালের ৩ জুলাই সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজধানীর রমনা থানায় মামলাটি করে দুদক। ওই বছরই ৪ জুলাই মামলাটি গ্রহণ করেন আদালত। তদন্ত শেষে দুদকের সহকারী পরিচালক হারুন-অর রশিদ ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, তার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে এ মামলায় অভিযোগপত্র দেন।

মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়া বাকি আসামিরা হলেন, মাগুরার সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, সাবেক মুখ্যসচিব কামালউদ্দিন সিদ্দিকী এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান। মামলার ছয় আসামির মধ্যে খালেদা জিয়া জামিনে রয়েছেন। মাগুরার সাবেক সাংসদ কাজী সালিমুল হক কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ কারাগারে আর তারেক রহমান, সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান পলাতক।

যে দুই ধারায় খালেদার বিরুদ্ধে বিচারকাজ পরিচালনা হয়েছে সেগুলো হলো, দণ্ডবিধির ৪০৯ ও দুদক আইনের ৫(২) ধারা। দণ্ডবিধির ৪০৯-এ বলা আছে, ‘যে ব্যক্তি তাহার সরকারি কর্মচারীজনিত ক্ষমতার বা একজন ব্যাংকার, বণিক, আড়তদার, দালাল, অ্যাটর্নি বা প্রতিভূ হিসাবে তাহার ব্যবসায় যে কোনো প্রকারে কোনো সম্পত্তি বা কোনো সম্পত্তির ওপর আধিপত্যের ভারপ্রাপ্ত হইয়া সম্পত্তি সম্পর্কে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ করেন, সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবে এবং তদুপরি অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবে।’ দুদক আইনের ৫(২) ধারা অনুযায়ী, ‘কোন সরকারি কর্মচারী অপরাধমূলক অসদাচরণ করিলে বা করার উদ্যোগ গ্রহণ করিলে তিনি সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের যোগ্য হইবেন।’

দীর্ঘ এই বিচার প্রক্রিয়ায় মামলা থেকে রেহাই পেতে খালেদা জিয়া উচ্চ আদালতে গেছেন একাধিকবার। তার অনাস্থার কারণে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তিনবার এ মামলার বিচারক বদল হয়েছে। পরে ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। একই বছরের ৭ মে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে এ দু’টি মামলা বকশীবাজার আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতে স্থানান্তর করা হয়।

অপরদিকে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় নিয়ে সারা দেশের বিরাজমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ মামলার রায়ে আজ বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় সব দল শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বপূর্ণ আচরণ করুক।

সে কর্মকর্তা বলেন, আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং সব দলকে সহিংসতা এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ আচরণের আহ্বান জানাচ্ছি। গণতন্ত্রের জন্য শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া খুবই জরুরি।

এর আগে বেগম জিয়ার রায়কে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রে পররাষ্ট্র দফতর ও হোয়াইট হাউসের সামনে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করেছে বিএনপি সমর্থকরা। এ ছাড়া লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসও ভাঙচুর করে বিএনপি সমর্থকরা।

এদিকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিক্ষোভে পুলিশিংয়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলতে প্রকাশ্যে নির্দেশ দেয়া উচিত বাংলাদেশ সরকারের।


মন্তব্য