kalerkantho


নিউ ইয়র্কে দু’ভাগে বিভক্ত আমেরিকা বাংলাদেশ প্রেসক্লাব

সাবেদ সাথী, নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি   

৩ মার্চ, ২০১৭ ১৪:৪৭



নিউ ইয়র্কে দু’ভাগে বিভক্ত আমেরিকা বাংলাদেশ প্রেসক্লাব

 চরম অনিয়ম, অপ্রীতিকর ঘটনা আর অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে দু’ভাগে বিভক্ত হলো নিউ ইয়র্কের আমেরিকা বাংলাদেশ প্রেসক্লাব। যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বাংলাদেশি আমেরিকান সাংবাদিকদের সংগঠন আমেরিকা বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের আভ্যন্তরিন বিষয় নিয়ে গত কয়েকবছর ধরে সংগঠনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েকজন কার্যনির্বাহী সদস্যের অন্তর্দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। মূলত পদ-পদবি আর অর্থ তসরুপের ঘটনা থাকলে তা কখনো প্রকাশ্যে আসেনি। আর এসব ঘটনা চরম আকার ধারন করায় এক পর্যায়ে নতুন কমিটি গঠনকল্পে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বাংলাদেশি আমেরিকান সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে নিউ ইয়র্কে আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ সংগঠনটির কখনো কোন নির্বাচন হয়নি। প্রতিবার মেয়াদ শেষে দু’একজন ব্যক্তির মনগড়া সিদ্ধান্তে তাদের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। এরমধ্যে সভাপতির পদ দুইদফা বদল হলেও সম্পাদকের পদটি থাকে অপরিবর্তিত। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো সংঠনের সভাপতি থাকা সত্ত্বেও গত ৮ বছর ধরে শুধুমাত্র সাধারন সম্পাদকের একক স্বাক্ষরে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা বা অর্থ লেনদেন করা হয়। শুরু থেকে অদ্যাবদি চালু ব্যাংকের হিসাবে স্বাক্ষরকারির নামও পরিবর্তন করা হয়নি। এ ধরনের নজির বিশ্বের কোথাও কোন সংঠনের নেই।

শুধু তাই নয় দু’বছর কার্যকালের হিসাব কখনোই স্বচ্ছ্বতার সাথে সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করা হয়না বলেও অভিযোগ তোলেন সাধারন সদস্যরা। এ ধরনের নানা অনিয়ম রোধকল্পে গোপন ব্যালটে নির্বাচনের দাবি উঠে। এ মর্মে গত ২৮ ডিসেম্বর রজ্যাকসন হাইটসে পালকি পার্টি সেন্টারে এক বিশেষ সভায় ৩ সদস্যের নির্বাচন কমিশনও গঠন করা হয়। ৩১ মার্চের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্নের অনুরোধ জানানো হয় নির্বাচন কমিশনকে। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল বর্তমান কমিটির শেষ মেয়াদ। নির্বাচন শেষে নব  নির্বাচিত কমিটির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান কমিটির মেয়াদও বৃদ্ধি করা হয় ৩১ মার্চ পর্যন্ত।
কার্যকরী কমিটির এ বৈঠকে এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এমন এক পরিস্থিতিতে সভাপতি গঠনতন্ত্র মতে নিজ ক্ষমতাবলে ১৯ মার্চ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। অথচ এটি করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কমিশনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে সভাপতির সাথে কথা বলার পরও তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। বিশেষ সভায় ৫৮ জনের মধ্যে ৫২ জনের উপস্থিতিতে গঠিত নির্বাচন কমিশন রীতি অনুযায়ী ১১ মার্চ নির্বাচনের তারিখসহ বিস্তারিত তপসিল ঘোষণা করেছেন। কিন্তু তা মানতে রাজি নন সভাপতি। তিনি গঠনতন্ত্রের দোহাই দিয়ে সভাপতির ক্ষমতাবলে নির্বাচন কমিশনকে বাতিলের কথা প্রচার করেছেন। যদিও এ ব্যাপারে কার্যকরী কমিটির কোন সভার প্রয়োজন বোধ করেননি। কার্যকরী কমিটির সিদ্ধান্ত ব্যতিত সভাপতির একক কোন এখতিয়ার গঠনতন্ত্রে নেই বলে উল্লেখ করেন বেশ কয়েকজন সদস্য।  

লাভলু-শহীদুল পরিষদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত:                                                                                                     
নির্বাচনে লাভলু-শহীদুল পরিষদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকসহ ৯টি পদে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বি না থাকায় নির্বাচন কমিশন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার রাতে লাভলু-শহীদুল প্যানেলকে নির্বাচিত ঘোষণা করে।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ছিল মনোনয়নপত্র জমা এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি ছিল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়ন জমাদানকারীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার ও বাছাই করার পর প্রতিটি পদের জন্য একজন করে প্রার্থী পাওয়া যায়। প্রত্যাহার ও বাছাই করার পর এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় মনোনয়ন জমা দেওয়া প্রার্থীদের প্রাথমিকভাবেভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতরা হলেন, সভাপতি সাপ্তাহিক ঠিকানা ও বিবিসি বাংলার যুক্তরাষ্ট্রের কন্ট্রিবিউটর লাভলু আনসার, সহ-সভাপতি নিউইয়র্কভিত্তিক প্রথম বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল বাংলা টিভির মহাপরিচালক মীর-ই ওয়াজিদ শিবলী, সাধারণ সম্পাদক সাপ্তাহিক বাঙালি ও দৈনিক ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি শহীদুল ইসলাম, যুগ্ম সম্পাদক বাংলা টিভির বিশেষ প্রতিনিধি রিজু মোহাম্মদ, কোষাধ্যক্ষ সাপ্তাহিক ঠিকানার বিশেষ প্রতিনিধি মোহাম্মদ আবুল কাশেম, কার্যকরী সদস্য আরটিভি যুক্তরাষ্ট্রের আবাসিক প্রতিনিধি আশরাফুল হাসান বুলবুল, সাপ্তাহিক ও এখনসময়ের ফটো এডিটর নিহার সিদ্দিকী, এটিএন বাংলা ইউএসএ’র বার্তা সম্পাদক কানু দত্ত এবং বাংলাভিশনের যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রতিনিধি মো. আজিম উদ্দিন অভি।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের বিশেষ সাধারণ সভায় সাধারণ সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে নির্বাচন কমিশন গঠন করেন। তিন সদস্যের কমিশনে প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক কাজী শামসুল হক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আকবর হায়দার কিরণ ও রাশেদ আহমেদকে নির্বাচন কমিশনার করা হয়।
গত মেয়াদের কার্যকরী কমিটি যথাসময়ে নির্বাচন করতে না পারায় ২৮ ডিসেম্বরের জরুরি সাধারণ সভায় বর্তমান কার্যকরী কমিটির মেয়াদ ৩১ মার্চ ২০১৭ পর্যন্ত বাড়ানোর অনুমোদন দেন সাধারণ সদস্যরা।    নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১১ মার্চ ভোটগ্রহণ হওয়ার যে ঘোষণা ছিল বিনা প্রতিদ্বন্দিতা কমিটির সব কর্মকর্তা নির্বাচিত ঘোষণার ফলে এখন আর ভোটগ্রহণ হবে না। তবে বর্তমান কার্যকরী কমিটির ক্ষমতা ৩১ মার্চ ২০১৭ পর্যন্ত বহাল থাকবে। এই সময়ের মধ্যে বর্তমান কমিটি নবনির্বাচিত কমিটির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে।

আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি সাঈদ, সম্পাদক রচি:
এদিকে,গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের জরুরি সাধারণ সভায় উপস্থিত সাধারণ সদস্যদের কণ্ঠভোটে নতুন কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সভাপতি হয়েছেন সাপ্তাহিক প্রবাস পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ সাঈদ এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন আজকাল পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক শওকত ওসমান রচি।
৯ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির অপরাপর কর্মকর্তারা হলেন সহ-সভাপতি দর্পণ কবীর (এটিএন বাংলা), সহ-সম্পাদক মনজুরুল হক (টিবিএন-২৪ টিভি), কোষাধ্যক্ষ মশিউর রহমান মজুমদার (সাপ্তাহিক বর্ণমালা) এবং নির্বাহী সদস্য নাজমুল আহসান (সম্পাদক-পরিচয়), সৈয়দ ওয়ালী উল আলম (প্রবাস), এবিএম সিদ্দিক (আজকাল) ও রফিকুল ইসলাম রফিক (টিবিএন ২৪টিভি)। এই কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির মেয়াদ বহাল থাকবে ২০১৮ সাল পর্যন্ত।
এদিন ক্লাবের জরুরি সাধারণ সভায় সভাপতিত্ব করেন ক্লাবের সভাপতি নাজমুল আহসান এবং সভা পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক দর্পণ কবীর। সভায় উপস্থিত অধিকাংশ  সদস্য কমিটি গঠনের দাবি উত্থাপন করেন।
সদস্যরা বলেন, ক্লাব গঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত সাধারণ সভায় কণ্ঠভোটে কার্যকরী কমিটি গঠিত হয়েছে। আজকের সভায়ও কমিটি গঠন করার গঠনতান্ত্রিক বিধি রয়েছে। সদস্যদের কণ্ঠভোটে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। একইসঙ্গে ক্লাবের স্বার্থ বিরোধী কর্মকাণ্ড এবং শৃঙ্খলা নষ্ট করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ৩জন ক্লাব সদস্যের প্রাথমিক সদস্য পদ বাতিল করা হয় সদস্যদের সম্মতিতে।
তারা হলেন কাজী শামসুল হক, রাশেদ আহমেদ ও আকবর হায়দার কিরণ। তারা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত থেকে সংগঠনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করায় তাদের সদস্য পদ বাতিল করা হয়।
এ সভায় বক্তব্য রাখেন আজকাল পত্রিকার প্রধান সম্পাদক জাকারিয়া মাসুদ জিকো, সৈয়দ ওয়ালি উল আলম, নাজমুল আহসান, দর্পণ কবীর, শওকত ওসমান রচি, জনতার কণ্ঠের সম্পাদক শামসুল আলম, শামছুল আলম লিটন, তোফাজ্জল লিটন, এবিএম সিদ্দিক, জাকির হোসেন জাহিদ প্রমুখ।                                     

 


মন্তব্য