kalerkantho

কালশী সড়কে যানজটের প্রধান কারণ চাঁদাবাজি

লায়েকুজ্জামান   

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কালশী সড়কে যানজটের প্রধান কারণ চাঁদাবাজি

মিরপুর হয়ে এয়ারপোর্ট সড়কে সহজে যাওয়া-আসার প্রধান সড়ক কালশী সড়ক। গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটিতে মাঝরাতেও ভয়াবহ যানজট লেগে থাকে। ভোর থেকে রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত সড়কটির দুই পাশের ফুটপাতে পসরা সাজিয়ে বসে দোকানিরা। আবার মধ্যরাত থেকে সড়কটি জুড়ে পার্ক করে রাখা হয় বিভিন্ন কম্পানির মালিকানাধীন বাস, লেগুনা, পিকআপ ভ্যান। সব মিলিয়ে সড়কটিতে ২৪ ঘণ্টাই লেগে থাকে যানজট। শুধু কালশীর প্রধান সড়ক নয়, ফুটপাতে দোকান বসানো হয়েছে এই সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত চারটি শাখা সড়কেও। এই শাখা সড়কগুলো হচ্ছে কালশী সড়ক থেকে ড ব্লক শাখা সড়ক, সাবেক জিয়া কলেজ বর্তমান পল্লবী কলেজ শাখা সড়ক, মুসলিম বাজার ও সিটি করপোরেশন পার্ক শাখা সড়ক। কালশী সড়কের যানজটের প্রভাব পড়ে এই শাখা সড়কগুলোতেও। পুরো এলাকায় প্রতিদিন অসহনীয় যানজটে ভুগতে হয় সাধারণ মানুষকে। এলাকাবাসী জানায়, তীব্র এ যানজটের প্রধান কারণ কালশীর প্রধান সড়কসহ শাখা সড়কগুলোতে বসানো ফুটপাতের দোকান।

কালশী সড়কে বসবাসকারী ক্ষমতাসীন দলের একজন স্থানীয় নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দলের নেতাদের প্রশ্রয়ে কিছু লোক ফুটপাতে দোকান বসানোর সুযোগ করে দিয়ে প্রতিদিন চাঁদা আদায় করছে। এ জন্য এই সড়কে যানজট কমানো যাচ্ছে না। যিনি চাঁদা আদায় করছেন তিনি দলের কেউ নন। তবে তাঁকে নেতারা এবং পুলিশ প্রশ্রয় দিচ্ছে।’

পল্লবী থানা আওয়ামী লীগের একজন নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দলের লোকেরাই শুধু চাঁদা তোলে না, পুলিশও টাকা নেয়। পুলিশ এবং দলের লোকেরা মিলেমিশে এই ভয়াবহ জনভোগান্তির সৃষ্টি করছে।’

স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতা, বাসের মালিক, সাধারণ মানুষ, ফুটপাতের দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কালশী প্রধান সড়ক ও শাখা সড়কগুলোর ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা আদায় করেন ফারুক হোসেন। কালশী এলাকায় তিনি যুবলীগের নেতা হিসেবে পরিচিত। তবে যুবলীগে তাঁর কোনো পদ-পদবি নেই। পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি তাজুল ইসলাম বাপ্পী চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই নামে পল্লবী থানা যুবলীগে কেউ নেই।’ ফারুক হোসেনও জানান, তিনি যুবলীগের কর্মী হলেও দলে কোনো পদ নেই। তবে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানিয়েছে, এলাকার মানুষজন তাঁকে আওয়ামী যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেনের লোক হিসেবে চেনে।

অন্যদিকে কালশী সড়কে অবৈধভাবে পার্ক করে রাখা বাসগুলো থেকে প্রতি রাতে ১০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করেন আরেক পদহীন যুবলীগ নেতা ইকবাল হাওলাদার। বিভিন্ন বাসের মালিক ব্যবসা করলেও রাতে বাস রাখার জন্য তাদের নিজস্ব জায়গা নেই। রাতে বাসগুলো রাখা হয় এলোমেলোভাবে বিভিন্ন সড়কে। মিরপুরে ওই সব বাস রাখার জন্য মালিককে চাঁদা দিতে হয়। ইকবাল হাওলাদার পার্কিংয়ে চাঁদাবাজির পাশাপাশি মিরপুর-১২ নম্বর সেকশনের বাস কম্পানিতে ব্যাক মানি চাঁদাবাজির সঙ্গেও জড়িত।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কালশী প্রধান সড়কসহ শাখা সড়কের ফুটপাতে বিভিন্ন ধরনের প্রায় ৫০০ দোকান বসানো হয়েছে। ওই সব দোকান থেকে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। ফারুক হোসেন নিজেই প্রতিদিন এই চাঁদার টাকা আদায় করেন। ওই চাঁদার টাকার একটি অংশ নেন পল্লবী থানার কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা।

ফুটপাতের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন ওই স্পট থেকে গড়ে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয় পুলিশকে। বাকি টাকা থাকে ফারুক হোসেনের নিয়ন্ত্রণে। যদিও পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পল্লবী থানার কোনো পুলিশ কর্মকর্তা চাঁদার টাকার ভাগ নেয় না।’ তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়, অনেক সময় দেখা যায় কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা এসে চাঁদার টাকা নিয়ে যান, এঁরা তাহলে কারা? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে এমন ঘটনা নেই।’

চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে ফারুক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি স্থানীয় লোক। কালশীতেই বেশির ভাগ সময় থাকি। যারা ফুটপাতে ব্যবসা করে তাদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আমার কাছে আসে। চাঁদাবাজি হয় তো হয়, তবে কারা করে জানি না। আমি ফুটপাত থেকে চাঁদা নিই না।’

এলাকাবাসী তো আপনার কথা বলে, আপনি চাঁদা তোলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ফারুক বলেন, ‘এত কথা তো বলতে পারব না...।’

কালশী সড়কে পার্কিং করা বাস থেকে চাঁদা তোলার বিষয়ে পদহীন যুবলীগ নেতা ইকবাল হাওলাদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা রাতের বাসগুলো দেখেশুনে রাখি। বিনিময়ে কিছু পয়সা নিলে দোষ কোথায়?’   

মন্তব্য