kalerkantho

মহান স্বাধীনতা দিবস আজ

আইনের খসড়া পড়ে আছে তিন বছর

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধ

রেজাউল করিম   

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অস্বীকার ও বিকৃতি রোধ করতে আইন প্রণয়নের দাবির মুখে তিন বছর আগে আইনের খসড়া প্রস্তুত করা হলেও সেটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। আইন কমিশন খসড়াটি প্রণয়ন করে ২০১৬ সালের ২১ মার্চ আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। এরপর আর কোনো অগ্রগতি নেই।

আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, আইনটি পাস হলে দেশি-বিদেশি কোনো ব্যক্তি প্রচারমাধ্যম, গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার বা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করে কিছু বললে ও লিখলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনের নামকরণ হয়েছে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকরণ অপরাধ আইন’।

একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, এ রকম আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি। দেশবিরোধী শক্তি, বিশেষ করে একাত্তরের পরাজিত শক্তি, মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে দেশে-বিদেশে নানাভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। দেশের একটি বড় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে নানাভাবে কথা বলে। তারা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা থেকে শুরু করে প্রতিটি বিষয় নিয়ে কটূক্তি ও মিথ্যাচার করে। প্রকারান্তরে তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকেই অস্বীকার করে। এ রকম চলতে থাকলে দেশ পথহারা হয়ে যাবে। এ জন্য আইনটি পাস করা জরুরি।

আইন কমিশনের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা (জেলা ও দায়রা জজ) ফউজুল আজিম কালের কণ্ঠকে বলেন, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে কমিশন দীর্ঘদিন গবেষণার পর খসড়াটি প্রস্তুত করে ২০১৬ সালের মার্চ মাসে আইন মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সেটি জমা দেওয়া হয়। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই।

আইন কমিশনের সাবেক সদস্য অধ্যাপক ড. এম শাহ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, সময়োপযোগিতা বিবেচনা করে আইন কমিশন এ রকম আইনের একটি খসড়া প্রস্তুত করেছিল।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, আইন প্রণয়নের বিষয়ে কাজ চলছে। যত দ্রুত সম্ভব এটি প্রণয়ন করা হবে।

আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আইনটি চূড়ান্ত ও পাস হলে মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা অস্বীকার, মুক্তিযুদ্ধের কোনো ঘটনাকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম বা প্রচারমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রদান বা প্রচার, ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রচারিত বা প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসংক্রান্ত দলিল এবং ওই সময়ের যেকোনো ধরনের প্রকাশনার অপব্যাখ্যা বা অবমূল্যায়ন, পাঠ্যপুস্তকসহ যেকোনো মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অসত্য, অর্ধসত্য, ভ্রান্ত বা বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন; মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা বা জনগণকে হত্যা, ধর্ষণ ও তাঁদের সম্পত্তি লুট বা অগ্নিসংযোগসংক্রান্ত যেকোনো তথ্যের অবনমন; মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত কোনো ঘটনা, তথ্য বা উপাত্ত ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন; মুক্তিযুদ্ধকে জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম ভিন্ন অন্য কোনো রূপে অবনমন বা অবমাননা; পাকিস্তানি দখলদার সশস্ত্র বাহিনী, তাদের বিভিন্ন সহায়ক বাহিনী, যেমন—রাজাকার, আলবদর, আলশামস ইত্যাদির বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমের পক্ষে কোনো ধরনের যুক্তি প্রদর্শন বা প্রচার; মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধকে সমর্থন বা ওই রকম অপরাধের বিচার কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বা এ বিষয়ে কোনো ধরনের অপপ্রচার অপরাধ বলে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের জন্য আইনে সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম কালের কণ্ঠকে বলেন, ইতিহাস বিকৃতি প্রতিহত করা এবং গণহত্যার মতো অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে ইউরোপের ১৪টি দেশে ‘হলোকস্ট অস্বীকৃতি আইন’ রয়েছে। ওই আইনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যার পরিসংখ্যান অস্বীকার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ রকম আইন করা জরুরি।

মন্তব্য