kalerkantho

নিখিলের ছোঁয়ায় ফিরছে পটচিত্র

শুভ আনোয়ার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়   

২৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নিখিলের ছোঁয়ায় ফিরছে পটচিত্র

বাংলার লোক-চিত্রকলার এক অনন্য ধারা পটচিত্র। বিলুপ্তির পথ ধরেছিল এই পেশা ও শিল্পকর্ম। তবে কয়েক বছরে একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এটি। যাঁর হাত ধরে নতুন প্রজন্মের তুলিতে আবার ফিরছে পটচিত্র ও পটগান তথা পটশিল্প, তিনি হলেন দেশবরেণ্য পটচিত্রশিল্পী নিখিল চন্দ্র দাস।

ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক ছিল নিখিল চন্দ্রের। আশপাশের গ্রামের বাজারে রং-তুলি পাওয়া যেত না। তাই মাটি দিয়ে পাতার আকৃতির ছবি আঁকতেন। বেজি ও ছাগলের লোম দিয়ে বানাতেন তুলি। পূজার আগে অবাক হয়ে দেখতেন ভাস্করদের কালী প্রতিমা বানানো। বাড়ি ফিরে অনুকরণ করতেন। পালা-পার্বণে মেলায় ঘুরে ঘুরে পালদের মাটির গয়না, পুতুল, মুখোশ কিনতেন। ভাবতেন, কিভাবে এমন তৈরি করেন, রং করেন! শিখতে ও জানতে ভাব জমাতেন তাঁদের সঙ্গে। তিনিই আজকের পটুয়া নিখিল চন্দ্র দাস। বাঁচিয়ে রেখেছেন বাংলার ৪০০ বছরের প্রাচীন পটচিত্র।

১৯৬১ সালে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার মাউলি গ্রামে নিখিল চন্দ্র দাসের জন্ম। পরিবারে তিন সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। বংশপরম্পরায় ছিল শিল্পের অনুকূল পরিবেশ। মা-বাবা দুজনেই ছবি আঁকতেন। মায়ের আলপনা, নকশা, চিত্রাঙ্কন দেখেই শৈশবে শিল্পের হাতেখড়ি। সংসারের আর্থিক টানাপড়েন থাকলেও তা তাঁর ছবি আঁকা শেখা ও জানার আগ্রহ কমাতে পারেনি।

নিখিল চন্দ্র বিশ্ববরেণ্য শিল্পী এস এম সুলতানের সান্নিধ্যে ছিলেন, সুলতানকে ‘কাকা’ বলে ডাকতেন। ২০ কিলোমিটার হেঁটে প্রতিদিন সুলতানের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। সুলতান তাঁর কাজ দেখে খুশি হয়ে নিয়মিত কাজ করতে উৎসাহ জোগাতেন। লোকজ শিল্পের একজন সংগ্রাহকও নিখিল চন্দ্র। নড়াইলের রাধা রানী, শেফালিসহ গ্রামের অনেক নারীর কাছে ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেছেন এক হাজার ২০০ লোকনাচের মুদ্রা। এগুলোর মধ্যে ৩৫০টি তাঁর কাছে ড্রইং করা আছে। বাকিগুলোর নাম ও বর্ণনা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। মনের মধ্যে একটি লুকানো ইচ্ছা একটি লোকশিল্প জাদুঘর গড়া।

পটশিল্পকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে দেশের আনাচকানাচে নিরন্তর ছুটে চলেছেন নিখিল চন্দ্র। ছোট-বড় সবাকেই শেখাচ্ছেন আপনমনে। তাঁর অর্জন বিলিয়ে দিচ্ছেন নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মাঝে। দিচ্ছেন প্রশিক্ষণ, তৈরি করছেন পটশিল্পী; যাতে নতুন প্রজন্ম পটচিত্রকে ধারণ করতে পারে।

 

এস এম সুলতানের স্মরণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) চারুকলা বিভাগে এস এম সুলতান রিসার্চ সেন্টারের আয়োজনে চলছে তিন দিনব্যাপী পটচিত্র কর্মশালা-২০১৯। কর্মশালার প্রশিক্ষক নিখিল চন্দ্র দাস। কর্মশালায় রবীন্দ্রভারতী, ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, চট্টগ্রাম, খুলনা, ইউডা বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্কুল ও কলেজের প্রায় ৭৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন।

গতকাল শনিবার কর্মশালার দ্বিতীয় দিনে নিখিল চন্দ্র কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের হাতেকলমে প্রাকৃতিকভাবে রং তৈরির কৌশল ও পটচিত্র অঙ্কনের প্রশিক্ষণ দেন। কর্মশালার অংশ হিসেবে গতকাল ছিল পটগান ও নৃত্য পরিবেশন। পটের গান মূলত পট এঁকে সেটি দেখিয়ে দেখিয়ে নৃত্যের তালে পরিবেশিত বাংলাদেশের এক বিশেষ ধরনের সংগীতধারা। বিলুপ্তপ্রায় পটের গান পরিবেশন করেন নড়াইলের পটের গানের শিল্পীরা। তাঁদের তত্ত্বাবধানে ছিলেন নিখিল চন্দ্র দাস।

নিখিল চন্দ্র দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের পটশিল্প হারিয়ে যেতে বসেছিল। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প যাতে হারিয়ে না যায় তাই আমার পরবর্তী প্রজন্মকে এই শিল্প শিখিয়ে দিতে চাই। যারা কর্মশালায় অংশ নিয়েছে তাদের সবার আগ্রহ দেখে আমার খুবই ভালো লেগেছে। এই শিল্পকে তারা ধারণ করতে আগ্রহী।’

আজ রবিবার কর্মশালার শেষ দিনে রয়েছে পটচিত্র পদর্শনী, সনদপত্র প্রদান ও পটের গান।

পটচিত্র কী : পট কথাটির অর্থ কাপড়। সংস্কৃত পট্ট (কাপড়) শব্দ থেকে পট শব্দের উৎপত্তি। এই পটে আঁকা চিত্রই পটচিত্র। এ চিত্র যাঁরা আঁকেন তাঁদের বলা হয় পটুয়া। পটচিত্র শুরু হয় বুদ্ধদেবের সময় খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে পঞ্চম শতকে। প্রাচীন বাংলায় যখন কোনো দরবারি শিল্পের ধারা গড়ে ওঠেনি, তখন পটচিত্রই ছিল বাংলার গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক।

পটশিল্পীরা নিজেরাই রং তৈরি করে নেন। রং তৈরি করা হয় পাতার রস, কালি, কাঠ-কয়লা, সিঁদুর বা আলতা, ইটের গুঁড়া ইত্যাদি দিয়ে। আর রঙের স্থায়িত্ব করা হয় বেলের আঠা, তেঁতুলের বীজ ও বাবলার আঠা দিয়ে। বাঁশের কাঠির মাথায় তুলা জড়িয়ে বানানো হয় তুলি। এর পরেই রং-তুলিতে বলা হয় বাংলার ঐতিহ্য বা পৌরাণিক গল্প।

 

 

মন্তব্য