kalerkantho

আজ বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস

ক্যান্সার-যক্ষ্মায় তালগোল!

রোগী ও চিকিৎসকদের সচেতনতার তাগিদ

তৌফিক মারুফ   

২৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘যক্ষ্মা হলে রক্ষা নাই’—একসময়ে যক্ষ্মা থেকে মানুষকে সচেতন থাকতে এই ভয়ংকর স্লোগান ব্যবহার করা হলেও এখন সেই স্লোগান মানুষের মন থেকে মুছতে যুক্ত করা হয়েছে ‘এই কথার ভিত্তি নাই’। অর্থাৎ যক্ষ্মা এখন আর ভয়ের কোনো রোগ নয়, বরং সময়মতো ও নিয়মিত চিকিৎসায় যক্ষ্মা ভালো হয়—বাংলাদেশেই যক্ষ্মার সব ধরনের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু আছে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে। তবে এই অভয় বাণীর মাঝে এখন এক নতুন বিভ্রান্তি শুরু হয়েছে ক্যান্সার আর যক্ষ্মা নিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্ষেত্রবিশেষ ক্যান্সার আর যক্ষ্মার উপসর্গ একই হয়ে যাওয়ায় প্রাথমিকভাবে যক্ষ্মাকে ক্যান্সার ধরে নেন এক শ্রেণির চিকিৎসক, যা রোগীর জন্য বড় ঝুঁকি বয়ে আনছে।

সরকারের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. শামিউল ইসলাম সাদী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে ধারণা ছিল যক্ষ্মা শুধু বুকের বা ফুসফুসেরই রোগ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ফুসফুসের পাশাপাশি মানুষের শরীরের যেকোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা স্থানেই যক্ষ্মা হতে পারে। আর ওই যক্ষ্মা ও ক্যান্সারের উপসর্গ অনেকটাই এক রকম, যা মাঠপর্যায়ের কিছু চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে ধরতে পারেন না। তাঁরা হয়তো ক্যান্সারকে যক্ষ্মা বা যক্ষ্মাকে ক্যান্সার ধরে প্রাথমিক কিছু চিকিৎসা শুরু করে দেন, যা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তির সুযোগ থাকে। এ জন্য আমরা চিকিৎসকদের এরই মধ্যে প্রশিক্ষণ ও সচেতন করার উদ্যোগ নিয়েছি।’ যদিও ওই কর্মকর্তা জানান, ঠিক কতসংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে তার কোনো পরিসংখ্যান জানা নেই।

জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোয়াররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, উপসর্গের কারণে ক্যান্সার ও যক্ষ্মা কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই রকম হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এটা ফুসফুসের ক্ষেত্রেও হওয়ার সুযোগ আছে। তবে বায়োপসি বা এফএনএসি করলে সেটা পরিষ্কার হওয়া যায়। তাই মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের উচিত নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হলে তা উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া এবং উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ওষুধে বা পরবর্তী চিকিৎসায় যাওয়া।

আরেক ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এহেতেশামুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, কোনো কোনো রোগীর ক্যান্সার ও যক্ষ্মা একই সঙ্গে হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে ক্যান্সার ও যক্ষ্মার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বোর্ড করা জরুরি। ফলে মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের উচিত এ ধরনের উপসর্গ দেখলে সেই রোগীকে দ্রুত রেফার করে দেওয়া। তাহলে রোগীর দ্রুত কার্যকর চিকিৎসা শুরু করা যায়।

রাজধানীর শ্যামলী বক্ষব্যাধি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আবু রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সংখ্যায় বেশি না হলেও মাঝেমধ্যে আমাদের কাছে এমন রোগী পাওয়া যায় যারা হয়তো অন্য কোথাও থেকে ক্যান্সারের রোগী বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হয়েছিল। তবে ক্যান্সার হলে যেহেতু ওই রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, তাই সেই সুযোগে ক্যান্সারের রোগীর যক্ষ্মা হওয়ার সুযোগ বেশি।’

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, দেশে বর্তমানে যক্ষ্মারোগী দুই লাখ ৬৭ হাজার ২৭৬ জন। এর মধ্যে শিশু যক্ষ্মারোগী শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৩৫২ জন। তবে দ্রুত নগরায়ণ, কর্মজীবী মানুষের স্থানান্তর, পরীক্ষা যন্ত্রের অপ্রতুলতা, জনসাধারণের মাঝে অসচেতনতা ও কুসংস্কারসহ বিভিন্ন কারণে এখনো ২৬ শতাংশ যক্ষ্মারোগী শনাক্তের বাইরে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস। এ দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘এখনই সময় অঙ্গীকার করার, যক্ষ্মামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার।’

এদিকে গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস উপলক্ষে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ব্র্যাক ও অন্যান্য সহযোগী সংস্থা যৌথভাবে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।  তাতে জানানো হয়, ২০১৮ সালের গ্লোবাল টিবি রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে দেশে এমডিআর যক্ষ্মারোগীর সংখ্যা এক হাজার ২৪০। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রতি লাখে ২২১ জন নতুন করে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয় এবং ৩৬ জন মৃত্যুবরণ করে। এ ছাড়া যক্ষ্মা নির্মূল করতে ২০১৫ সালের তুলনায় ২০৩৫ সালে যক্ষ্মায় মৃত্যুর হার ৯৫ শতাংশ এবং প্রকোপের হার ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনতে চায় সরকার।

 

মন্তব্য