kalerkantho

বেচাকেনা না হলেও চাঁদা থেকে রেহাই নেই

ফুটপাতে চাঁদাবাজি
মিরপুর স্পট-৪

লায়েকুজ্জামান   

২৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মিরপুর বিহারি ক্যাম্প এলাকার সড়কে দাঁড়িয়ে পেয়ারা বিক্রি করেন সাভারের মফিজুল ইসলাম। কথায় কথায় তিনি বললেন, ‘কী আর বলব ভাই, চাঁদার যন্ত্রণায় আর বাঁচি না। পুরো দিন বিক্রি করলে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। এর মধ্যে দেড় শ টাকা চাঁদা দিতে হয় আড্ডু নেতাকে। এখন সে প্রতিদিন চাচ্ছে ২০০ টাকা। সব দিন এক রকম বিক্রি হয় না। কোনো কোনো দিন ২০০ টাকাও থাকে না। বেচাকেনা হোক আর না হোক, প্রতিদিন চাঁদার টাকা পরিশোধ করে তবেই বাড়ি যেতে পারি। না হলে পরের দিন তো আর বিক্রি করতে দেবে না।’

মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের কাঁচাবাজার ও বিহারি ক্যাম্প এলাকার ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলেন পদহীন যুবলীগ নেতা আড্ডু। ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা জানে, আড্ডু সরকারি দলের বড় নেতা। চলনে-বলনে-হুঙ্কারে প্রতিনিয়ত সেটাই জাহির করেন আড্ডু। পল্লবী থানা যুবলীগ ও পুলিশের সঙ্গে সখ্য রয়েছে তাঁর। শুধু ফুটপাত থেকেই নয়, যুবলীগের নাম ভাঙিয়ে আড্ডু মিরপুরে পরিবহন চাঁদাবাজির সঙ্গেও জড়িত। মিরপুর-১২ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে ‘ব্যাক মানি’র নামে যারা চাঁদাবাজি করে থাকে তাদের একজন এই আড্ডু।

মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে রয়েছে একটি সরকারি কাঁচাবাজার। ওই কাঁচাবাজারের তিন দিক ঘিরে সড়কের ফুটপাতে বসানো হয়েছে দোকান। কাঁচাবাজারের ওই স্পটে দোকানের সংখ্যা ৫২০। বেশির ভাগ শাকসবজি ও ফলের দোকান। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এ ছাড়া মিরপুর বিহারি ক্যাম্প এলাকা থেকে কালশী সড়ক পর্যন্ত এলাকায় বসানো হয়েছে আরো ৩০০ দোকান। শাকসবজি, ফল, মুুরগি, ঝালমুড়ি, ভাসমান ফাস্ট ফুড বিক্রি করা হয় ফুটপাতের এসব দোকানে। সেখানকার ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিহারি ক্যাম্প এলাকায় ব্যবসার ধরনভেদে চাঁদা দিতে হয় ১০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত। গড়ে প্রতিদিন এই স্পট থেকে চাঁদা তোলা হয় এক লাখ ২০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। এই টাকার ভাগ আড্ডু একা নিতে পারেন না। চাঁদার একটি অংশ দিতে হয় ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নান্নুকে। নান্নু আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং পল্লবী থানা আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য।

পল্লবী থানা আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দলে আড্ডুর পদ-পদবি না থাকলেও এলাকায় সে যুবলীগের নেতা হিসেবে পরিচিত। নিয়মিত দলের মিটিং-মিছিলে অংশ নেয়। ফুটপাতের ওই এলাকার চাঁদা আড্ডু একা নেয় না, নান্নু কমিশনারকেও ভাগ দিতে হয়।’

মিরপুর-১১ নম্বর কাঁচাবাজারের সামনের ফুটপাতে সবজির ব্যবসা করেন এমন এক দোকানি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দয়া করে পত্রিকায় আমার নামটা লিখবেন না। মিরপুর বাঙলা কলেজ থেকে বিএ পাস করেছি বেশ কয়েক বছর আগে। বেকারত্বের যন্ত্রণা ঘোচাতে, সংসারের অভাবের তাড়নায় ফুটপাতে সবজির দোকান দিয়েছি। ফুটপাতে এই দোকান শুরু করতে যুবলীগ নেতা আড্ডুকে ১১ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। আর এখন প্রতিদিন দিতে হয় ২৫০ টাকা।’

চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে পদহীন যুবলীগ নেতা আড্ডু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফুটপাতে চাঁদাবাজি হয় এটা ঠিক, তবে আমি চাঁদাবাজি করি না। আমি কারো কাছ থেকে টাকা নেই না।’

কিন্তু ফুটপাতের দোকানিরা তো আপনার নাম বলছে। এ কথার জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার নাম করে হয়তো কেউ চাঁদা তুলতে পারে। সেটা আমার জানা নেই।’

আপনার দলের লোকরাও তো আপনার নাম বলছে। এমনটি কথা বললে আড্ডু জবাব না দিয়ে চুপ থাকেন।

চাঁদার ভাগের বিষয়ে ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নান্নু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, আমার চাঁদার টাকার প্রয়োজন নেই। ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলা হয় এটা ঠিক, তবে আমি ভাগ নেই না। আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’

আপনি চাঁদার ভাগ নেন, আপনার দলের লোকরাই এ কথা বলছে। এমনটি বলা হলে নান্নু উত্তেজিত কণ্ঠে বলেন, ‘কারো সাহস থাকলে আমার সামনে এসে বলতে বলুন।’

 

মন্তব্য