kalerkantho

সেদিন সবার দক্ষতায় ব্যর্থ হয় বিমান ছিনতাইচেষ্টা

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

২৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ বিমানটি চট্টগ্রামে পৌঁছতে সময় লাগত ৩৫ মিনিট। বিমান ছিনতাইচেষ্টার বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর পাইলট মোহাম্মদ গোলাম সাফি নির্ধারিত সময়ের সাত মিনিট আগেই বিমানটি চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে সফলভাবে অবতরণ করাতে সক্ষম হন। বিমান ছিনতাইচেষ্টার সঙ্গে জড়িত পলাশকে নানা কৌশলে ব্যস্ত রাখেন কেবিন ক্রু শাহেদুজ্জামান সাগর। ইন্টারকমে পলাশকে পাইলটের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দিয়ে এই ফাঁকে নামানো হয় বিমানটি এবং ইমার্জেন্সি দরজা খুলে দিয়ে যাত্রীদের দ্রুত নামিয়ে আনা হয়। প্রাণে বাঁচে ১৪৮ যাত্রীর সবাই।

ছিনতাইচেষ্টার ঘটনায় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ফ্লাইটটির পাইলট ও কেবিন ক্রুদের দক্ষতা এবং সাহসিকতার এই চিত্র ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশ বিমানের উড়োজাহাজ বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ‘ময়ূরপঙ্খী’র ছয় পাইলট ও কেবিন ক্রু গত বুধবার রাতে চট্টগ্রাম এসে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটে ঘটনার বিবরণ দেন। বাকি একজন কেবিন ক্রু দায়িত্বরত থাকার কারণে দেশে না থাকায় উপস্থিত হননি। যে ছয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, তাঁরা হলেন ময়ূরপঙ্খীর পাইলট মো. গোলাম সাফি, ফার্স্ট অফিসার মুনতাসির মাহমুদ, কেবিন ক্রু শাফিকা নাসিম নিম্মী, হোসনে আরা, শরীফা বেগম রুমা ও আব্দুর শাকুর মুজাহিদ।

কী কারণে এই ‘বিমান ছিনতাইচেষ্টা’ জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক রাজেশ বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো কারণ বলার সময় আসেনি।  বিমানের ছয়জনসহ এবং চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক ও কর্মকর্তা মিলে এ পর্যন্ত আমরা ১২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রী মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মশিউর রহমানসহ আরো অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করার পরই কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলতে পারব।’

বিমান ছিনতাইচেষ্টাকারী পলাশ আহমেদের সাবেক স্ত্রী চিত্রনায়িকা শিমলাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে জানিয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘শিমলা এখন ভারতের মুম্বাইয়ে আছেন। বিমানসংশ্লিষ্ট সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পরই তাঁকে ডাকা হবে।

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা রাজেশ বড়ুয়া আরো বলেন, সেদিন সবার শেষে বিমান থেকে নামা কেবিন ক্রু শাহেদুজ্জামান সাগর এখন দায়িত্ব পালনের জন্য দেশের বাইরে আছেন। এ কারণে বুধবার তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি। দেশে আসার পর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

প্রাপ্ত বক্তব্যের ভিত্তিতে রাজেশ বড়ুয়া বলেন, ‘ঘটনার সূত্রপাত হয় সিটে বসাকে কেন্দ্র করে। বিমান ছিনতাইচেষ্টাকারী পলাশ আহমেদ ১৭-ডি নম্বর আসনে বসা ছিলেন। বিমান উড়ার আনুমানিক ১৬ থেকে ১৮ মিনিট পর পলাশ তাঁর নির্ধারিত আসন থেকে উঠে সামনের একটি বিজনেস শ্রেণির পরের আসনে গিয়ে বসেন। বিমানের সিনিয়র কেবিন ক্রু শাফিকা নাসিম বিষয়টি লক্ষ করে কর্তব্যরত জুনিয়র ক্রু হোসনে আরাকে নির্দেশ দেন, পলাশকে যেন তাঁর নির্ধারিত আসনে বসিয়ে দেওয়া হয়। হোসনে আরা পলাশকে অনুরোধ করতে গেলেই হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন পলাশ। ডান হাতে নিজের ব্যাগ থেকে পিস্তল বের করে হোসনে আরার মাথায় ধরে বলেন, ‘এই বিমানটি ছিনতাই হয়েছে। বিমানের ককপিটের দরজায় লাথি মারতে মারতে বলেন আমি পাইলটের সঙ্গে কথা বলব।’ এই ঘটনায় উপস্থিত যাত্রীরা সবাই হতভম্ব হয়ে পড়ে; যদিও পেছনের সব যাত্রী তখনো বিষয়টি বুঝতে পারেনি।

জিজ্ঞাসাবাদে কেবিন ক্রু ও পাইলট পুলিশকে জানিয়েছেন, পিস্তল নিয়ে পলাশ বিমানের সিটের মাঝখানে হাঁটার পথে কয়েক দফা অস্থিরভাবে পায়চারি করতে থাকলে যাত্রীরা সবাই টের পায় এবং আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কিন্তু ভয়ে কেউই চিৎকার-চেঁচামেচি করেনি।

তবে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে কেবিন ক্রু শাফিকা নাসিম একটি গোপন কোড ব্যবহার করে ককপিটে থাকা পাইলট ও ফার্স্ট অফিসারকে বিষয়টি অবহিত করেন। আর ককপিট থেকে পাইলট লাইভ স্ক্রিন (ভিডিও ক্যামেরা) অন করে সেখানে পলাশের গতিবিধি প্রত্যক্ষ করেন। পলাশকে ককপিটের দরজায় লাথি মারতে দেখেন তিনি। তখন তাঁর ডান হাতে পিস্তল এবং বাঁ হাতে বিস্ফোরকসদৃশ বস্তু ছিল।

সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টি শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জানিয়ে দেন পাইলট মোহাম্মদ গোলাম সাফি। একই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা টিমসহ সংশ্লিষ্ট সব যাত্রীকে রক্ষায় প্রস্তুত রাখার জন্য পাইলট বলেন। বিমানটি তখন ৩৫ হাজার ফুট ওপর দিয়ে চলছিল। তিনি বিমানটি দ্রুত নিচে নামানো শুরু করেন। হঠাৎ করে নামতে থাকায় যাত্রীরা ভয় পেয়ে যায় এবং চিৎকার শুরু করে। 

পলাশ আহমেদ তাঁর সাবেক স্ত্রী শিমলার বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে সেই সুযোগ দেওয়ারও আশ্বাস দেওয়া হয় বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা। কেবিন ক্রুরা বিমানে ‘পটকা ফোটার মতো’ দুটি আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যাত্রীরা নেমে যাওয়ার পর কেবিন ক্রু সাগরকে পলাশের সঙ্গে রেখে অন্য কেবিন ক্রু এবং পাইলটও বিমান থেকে নেমে পড়েন।’ বিমান অবতরণের আগেই সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো টিম, র‌্যাব ও পুলিশের দল রানওয়েতে পৌঁছে যায়। কেবিন ক্রু সাগর ও পলাশকে রেখে সবাই নেমে যাওয়ার পর কমান্ডো অভিযানে পলাশ নিহত হন।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে চাঞ্চল্যকর বিমান ছিনতাইচেষ্টা ঘটনার পর কমান্ডো অভিযানে নিহত হন পলাশ আহমেদ। ২৬ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো টিম ও র‌্যাব অস্ত্র, বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করে পুলিশকে জমা দেয়। পলাশের হাতে থাকা পিস্তলটি বাংলাদেশে তৈরি প্লাস্টিকের একটি খেলনা বলে এরই মধ্যে প্রতিবেদন দিয়েছে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ।

ঢাকা থেকে ১৪৮ জন যাত্রী নিয়ে সেদিন চট্টগ্রামের উদ্দেশেই রওনা হয়েছিল বিমানের ময়ূরপঙ্খী। চট্টগ্রাম হয়ে যাত্রী নিয়ে রাতেই দুবাই পৌঁছানোর কথা ছিল উড়োজাহাজটির। ঘটনার পর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানায় একটি মামলা করে। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটকে।

মন্তব্য