kalerkantho

থানার পাশে বসেই স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার চাঁদাবাজি

লায়েকুজ্জামান   

২৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



থানার পাশে বসেই স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার চাঁদাবাজি

মিরপুর-১২ নম্বর সেকশনের পল্লবী থানার গেট থেকে উত্তর-দক্ষিণে রাস্তার দুই পাশে কাপড়, ভ্যানগাড়ির খাবার, মাছ, মুরগি, সবজি, ঝালমুড়ির দোকানসহ বিভিন্ন ধরনের ৮৭৬টি দোকান রয়েছে। একাধিক দোকানি ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়,  ৮৭৬টি দোকান থেকে প্রতিদিন গড়ে চাঁদা তোলা হয় ২০০ টাকা করে। এই হিসাবে প্রতিদিন চাঁদা আদায় করা হয় এক লাখ ৭৫ হাজার ২০০ টাকা।

মুরগির দোকানি কাশেম প্রায় দেড় দশক আগে ঢাকা শহরে এসেছিলেন। সাত সদস্যের সংসার চলে ফুটপাতে মুরগি বিক্রির আয়ে। চাঁদার বিষয়ে আলোচনা তুলতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। বলেন, ‘সরকারি জায়গা ফুটপাতে বসে মুরগি বিক্রি করি তাও নেতাকে প্রতিদিন চাঁদা দিতে হয় ২০০ টাকা। এমন অনেক দিন যায়, বৃষ্টি-বাদলে বিক্রি হয় না। কিন্তু তার পরও চাঁদার টাকা দিতেই হয়। ওনারা চাঁদা বলেন না, বলেন ভাড়া। কোন লীগের নেতা যেন রুমান সাব, লোক পাঠিয়ে চাঁদার টাকা আদায় করেন।’

ঝালমুড়ি বিক্রেতা আবুল বলেন, ‘ভাই, সারা দিন বিক্রি করে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা রোজগার হয়। তার মধ্যে ১০০ টাকা রুমান সাবকে চাঁদা দিতে হয়। আমাদের দুঃখের কথা বলেও লাভ নেই। লিখেও লাভ নেই।’

এই স্পটে প্রতিদিন কাপড়ের দোকান ৩০০, বার্গারের দোকান ৫০০, মাছের দোকান ২০০, মুরগির দোকান ২০০, ঝালমুড়ি ১০০, সবজির দোকানপ্রতি ২০০ টাকা করে চাঁদার পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যা নামতেই প্রতিদিন কজন কিশোর দল বেঁধে চাঁদার টাকা আদায়ে মাঠে নামে। চাঁদা সংগ্রহকারী এক কিশোর নিজের পরিচয় দেয় বাবু বলে। তার কাছে জানতে চাই কিসের টাকা তুলছ? সে বলে, ‘ভাড়া তুলি। ভাড়ার টাকা তুলে রুমান ভাইকে দেই। আমি প্রতিদিন কাপড়ের দোকান থেকে তুলি ৩০০ টাকা করে। ২০টি দোকান থেকে টাকা তোলার দায়িত্ব আমার। বিনিময়ে আমাকে প্রতিদিন ৪০০ টাকা দেওয়া হয়।’

পল্লবীর ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতা-কর্মী ও ফুটপাতের দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই স্পটের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রক পল্লবী থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রুমান। তাঁর বাবা সিটি করপোরেশনের দাপুটে চাকরিজীবী। এলাকাজুড়ে রয়েছে পিতা-পুত্রের লাগামহীন দাপট। ফুটপাতের দোকানিরা কিছুই না, এই দুজনের দাপটে তটস্থ থাকে এলাকার ক্ষমতাসীন দলের অনেকে। পল্লবী থানার গেটের পাশেই স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রুমানের অস্তানা। এখানে বসেই চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।

পল্লবী থানা আওয়ামী লীগের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে এত উন্নয়ন করার পরও সাধারণ মানুষ আমাদের প্রতি খুশি না এসব চাঁদাবাজের কারণে। চাঁদাবাজি করে এরা কোটিপতি হলেও ডুবাচ্ছে দলকে। দল বা সরকারে এসব দেখার কেউ আছে বলে মনে হয় না।’

পল্লবী থানা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রুমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি চাঁদাবাজি করি না। ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলা হয় এটা ঠিক, কিন্তু কে তোলে আমি জানি না।’

ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা তো আপনার কথাই বলে, আপনি টাকা নেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওরা ঠিক বলছে না। আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’ কিন্তু আপনার দলের লোকেরাও আপনার কথা বলে। এর জবাবে তিনি বলেন, ‘দলের কেউ কেউ বলতে পারে, কারণ দলের মধ্যে গ্রুপিং থাকে।’

থানার গেট এলাকার ফুটপাতে চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার জানা মতে এখানে কোনো চাঁদাবাজি হয় না। পল্লবী থানার কোনো পুলিশও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয়।’

মন্তব্য