kalerkantho

অভিনব কৌশলে বাড়ছে প্রতারণা

৪৬ দিনে গ্রেপ্তার ৭০

ওমর ফারুক   

২২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ওরা তিনজন। একজন সাজে জাদুকর, আরেকজন প্রবেশ করে কবরে। অন্যজন দাফন সম্পন্ন করে। এভাবে জিন্দা মানুষকে কবর দেওয়ার তেলেসমাতি দেখিয়ে প্রতারণা করে গ্রামবাসীর কাছ থেকে হাতিয়ে নিত টাকা। নাটরে শেষ পর্যন্ত এই প্রতারকচক্র আটক হয় পুলিশের হাতে।

নিত্যনতুন কায়দায় এদের মতো আরো অনেক প্রতারক রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালিয়ে যাচ্ছে প্রতারণা। তাদের কেউ সাজছে পুলিশ, র‌্যাব, কেউ জাদুকর, অফিসের বড় বস, এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও থেমে নেই। এ ধরনের প্রতারকদের গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত ৪৬ দিনে শুধু র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে ৭০ প্রতারক।

গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে প্রতারণার অভিনব সব কৌশলের কথা শুনে হতবাক হচ্ছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও। র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের প্রধান মুফতি মাহমুদ খান কালের কণ্ঠকে জানান, একের পর এক প্রতারকচক্র গ্রেপ্তারের পরও কমছে না। মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে দিন দিন অভিনব সব প্রতারণার কৌশল অবলম্বন করছে প্রতারকচক্র।

র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার দুই প্রতারক আনিসুর রহমান ওরফে বাবুল ও তার সহযোগী ইয়াসিন তালুকদার। এই দুজন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে গিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে অন্তত ৫০০ কর্মকর্তাকে মামলার ভয় দেখিয়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। শেষে গত ১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তারা জানায়, ২০১৪ সাল থেকে প্রতারণা করছে তারা। দুর্নীতি দমন কমিশন দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করলে তারা সরকারি দপ্তরে গিয়ে প্রতারণার ফন্দি আঁটে। সফলও হয়। তারা টার্গেট করা সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে দুর্নীতির মামলা প্রক্রিয়াধীন বা দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ হচ্ছে এমন ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছিল হাজার হাজার টাকা।

নাটোরের তিন প্রতারক হলো—মনোয়ার হোসেন, পলাশ ও সেলিম হোসেন। এই চক্রটি গ্রামে গ্রামে গিয়ে জীবিত মানুষকে কবর দিয়ে প্রতারণা করে আসছিল। গত ২২ ফেব্রুয়ারি নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগর ইউনিয়নের রহিমানপুর গ্রামে এমন প্রতারণা করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এই তিন প্রতারক। বর্তমানে এই তিন প্রতারক জেলে রয়েছে বলে জানান বাগাতিপাড়া থানার সাব-ইন্সপেক্টর রাকিবুল ইসলাম। 

পুলিশ জানায়, প্রতারকচক্রের সদস্য সেলিমের মুখ বেঁধে কবরে শুইয়ে দিত অন্য দুই প্রতারক। কবরে বিশেষ কায়দায় বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা রেখে দাফনের কাজ শেষ করত তারা। শত শত মানুষ এই সময় জাদু দেখার মতো কবরের চারপাশে ভিড় করত। এ সময় হঠাৎ পাল্টে যেত প্রতারকদের সুর। তারা বলত টাকা-পয়সা দিতে হবে। না হয় বাঁচানো যাবে না দাফন করা ব্যক্তিকে। আর মরে গেলে ওই গ্রামের কেউ রেহাই পাবে না। এমন পরিস্থিতিতে গ্রামের সাধারণ মানুষ প্রতারকচক্রের হাতে তুলে দিত টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার। বিষয়টি নজরে আসে বাগাতিপাড়া থানা পুলিশের। শেষে গ্রেপ্তার করা হয় ওই প্রতারককে।

 

এর আগে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশের পোশাক, ওয়াকিটকিসহ রাব্বী নামের এক প্রতারককে যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব ১০-এর সদস্যরা। গত ২ মার্চ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আরো ২২ প্রতারককে। এই চক্রের সদস্যরা সরকারি, বেসরকারি অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের টার্গেট করে অল্প পুঁজিতে অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছিল লাখ লাখ টাকা।

গত ১৪ মার্চ রাজধানীর ভাটারা থানার কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিদেশি মুদ্রাসহ প্রতারকচক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব ১-এর সদস্যরা।

র‌্যাব ১-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম জানান, চক্রটি বিভিন্নভাবে জনসাধারণকে ফাঁদে ফেলে প্রতারণা করত। প্রতারকদের সবাই পেশায় রংমিস্ত্রি।

র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের প্রধান মুফতি মাহমুদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা একের পর এক প্রতারক গ্রেপ্তার করছি। কিন্তু প্রতারক কমছে না। মানুষের লোভের কারণে দিন দিন বাড়ছে প্রতারক। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে সচেতন হতে হবে। ৫০ টাকা দিলে ১০০ টাকা পাওয়া যাবে—এমন লোভ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

মন্তব্য