kalerkantho

‘একটা পয়সাও লাগল না!’

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে সারা দেশে বিনা মূল্যে চিকিৎসা

তৌফিক মারুফ   

১৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘আজীবন শুধু শুনছি সরকারি হাসপাতালে ফ্রি চিকিৎসা হয়, কোনো দিনই তো ফ্রি চিকিৎসা পাই নাই। টিকিট কাটার ১০ টাকা থেকে শুরু করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গেলে সব জায়গাতেই কিছু না কিছু টাকা লাগেই। কিন্তু আজ জীবনে প্রথমবারের মতো সত্যিকারের ফ্রি চিকিৎসা পাইলাম। এমনকি টিকিট, ইসিজি-ইকো তাও ফ্রি।’

গতকাল রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের নিচতলার বহির্বিভাগ থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে এভাবেই কথাগুলো বললেন খাদেমুল ইসলাম। তিনি তাঁর এক মামাকে নিয়ে এসেছিলেন চিকিৎসার জন্য।

একই করিডোরের আরেক প্রান্তে রুহেলা তাবাসসুম নামের এক ছাত্রী বেশ উচ্ছ্বাস নিয়েই বলেন, ‘মাকে নিয়ে এসেছিলাম ডাক্তার দেখাতে। আজ এখানে একটি পয়সাও খরচ হলো না, যা টাকা নিয়ে এখানে ঢুকেছিলাম, পুরোটা নিয়েই আবার বাসায় ফিরছি।’ উচ্ছ্বাসের প্রকাশটা আরো বাড়িয়ে ওই তরুণী বলেন, ‘ইস্! প্রতিদিনই যদি এমন ফ্রি চিকিৎসার সুযোগ থাকত, তবে মানুষের কতই না উপকার হতো!’

পাশের শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও দেখা গেল একই চিত্র।

হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে এসে এত খুশি কেন—জানতে চাইলে মোহাম্মদপুরের রোকসানা বেগম বলেন, ‘কাইলক্যাই একজনের কাছে হুনছিলাম আইজক্যা এইহানে ফ্রি চিকিৎসা দিব। একটা টাহাও নাকি লাগত না। তাই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেহাইতে আইলাম। আলট্রাসনোগ্রাম করছে, হেইডাও বিনা টাহায়।’

দুপুর ১২টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফটকে দাঁড়িয়ে ফোনে একজন বেশ উচ্চৈঃস্বরেই বলছিলেন, ‘আফারে লইয়া তাড়াতাড়ি আইয়া পড়েন, আর অল্প সময় আছে কিন্তু, আইজ সবকিছুই ফ্রি, কোনো টাকা লাগব না। আমার বুকের এক্স-রে করাইছি।’

ফোন ছাড়ার পর মোনাম নামের ওই যুবক জানান, তিনি শ্বাসকষ্টের সমস্যার জন্য ডাক্তার দেখাতে এসেছিলেন। বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও রোগ পরীক্ষা করিয়েছেন। সব কিছু বিনা মূল্যে করা যাচ্ছে দেখে তাঁর অসুস্থ বড় বোনকে নিয়ে আসার জন্য তাঁর স্বামীকে ফোন করেছেন।

কেবল রাজধানীর এই দু-তিনটি হাসপাতালেই নয়, বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উদ্‌যাপন উপলক্ষে  স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গতকাল সারা দেশের সব সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষাও ছিল বিনা মূল্যে। এ ছাড়া ভর্তি রোগীদের জন্যও ছিল বিশেষ খাবারের আয়োজন। ঈদের দিনের মতো উন্নত খাবার পরিবেশন করা হয়।

অন্যদিকে সরকারি হাসপাতাল না হলেও সরকারের নির্দেশনা অনুসরণ করে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে বিনা মূল্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এ হাসপাতালে বিনা মূল্যে ছয় হাজার ৮০০ জন রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে মেডিসিন ও শিশু অনুষদে তিন হাজার ৩০০ রোগী, সার্জারি অনুষদে দুই হাজার ৯০০ রোগী এবং ডেন্টাল অনুষদে ৬০০ রোগী। এ ছাড়া ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের উদ্যোগে ৫০ জনের রক্তের গ্রুপও বিনা মূল্যে নির্ণয় করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিনা মূল্যে ২৫১ রোগীকে আলট্রাসাউন্ড, ১৮৫ রোগীকে এক্স-রে সেবা এবং দুই হাজার ৯৮৩ জনকে প্যাথলজি সেবা দেওয়া হয়। এসব সেবার জন্য মোট তিনটি ভবন থেকে রোগীদের বিনা মূল্যে টিকিট দেওয়া হয়। এই কার্যক্রমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৮ জন অধ্যাপক, ৭০ জন সহযোগী অধ্যাপক, ৯০ জন সহকারী অধ্যাপক, ২৮ জন কনসালট্যান্টসহ ৪৫০ জন চিকিৎসক, ৬০ জন নার্স, ১২৫ জন বিভিন্ন পর্যায়ের টেকনিশিয়ান, ২৫ জন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, কমপক্ষে ২০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সাড়ে ৮০০ জনবল নিয়োজিত ছিল বলেও জানায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো আমরা নিজস্ব উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উদ্‌যাপন উপলক্ষে রোগীদের ফ্রি চিকিৎসাসেবা দিয়েছি।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আজ সব কিছুই ফ্রি, আউটডোরে আজ কোনো ফি রাখিনি। রোগীর ভিড়ও হয়েছে ভালোই।’

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান বলেন, ‘আজ আমরা আউটডোরে প্রায় ৬০০ রোগীকে ফ্রি সেবা দিয়েছি। ইসিজি হয়েছে ৩০০ জনের বেশি, ইকো হয়েছে ১৭০ জনের। কোনো কিছুতেই কোনো ফি রাখা হয়নি।’

মন্তব্য