kalerkantho

কর্ণফুলীর উচ্ছেদ অভিযান

আটকে আছে মাস্টারপ্ল্যানেই

উদ্ধার হওয়া ১০ একরের এক একরে দেয়াল দিচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মাস্টারপ্ল্যানের অজুহাতে থমকে গেছে কর্ণফুলী নদীর উচ্ছেদ অভিযান। প্রথম দফার সাহসী অভিযানে ১০ একর জমি অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধারের পর দ্বিতীয় দফা অভিযান চালানোর প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু পিছু হটে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। গত এক মাসের বেশি সময়েও নতুন কোনো অভিযান হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দ্বিতীয় দফা উচ্ছেদ অভিযানের তালিকায় মূলত দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা রয়েছে। তাদের রক্ষা করতেই অভিযান কৌশলে বিলম্বিত করা হচ্ছে।

তবে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘কাউকে রক্ষা করতে অভিযান থমকে যায়নি। মূলত উদ্ধার করা জমি কিভাবে রক্ষা করব সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের টাকা নিয়ে অনেক কষ্টে অবৈধ জমি উদ্ধার করলাম, বন্দর সেগুলো লিজ দিল কিংবা প্রশাসন বরাদ্দ দিল, তাহলে তো সরকারের এবং উচ্চ আদালতের রায়ের উদ্দেশ্য সঠিকভাবে প্রতিফলন হলো না। আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে একটি সিদ্ধান্ত চাইছি, উদ্ধারের পর জমির কী হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এমন কিছু করতে চাই না যেটা দিয়ে কর্ণফুলী দূষণমুক্ত হবে না, নাব্যতা রক্ষা হবে না। জমি দখলে রাখতেই জাতীয়ভাবে মাস্টারপ্ল্যান তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেই মাস্টারপ্ল্যানে উদ্ধার করা ভূমি রক্ষায় গাইডলাইন থাকবে। তাই দ্বিতীয় ধাপের অভিযান আপাতত বন্ধ। মাস্টারপ্ল্যান হাতে পেলে উচ্ছেদ অভিযানের পাশাপাশি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলবে। দ্বিতীয় ধাপের উচ্ছেদ অভিযান চালাতে নতুনভাবে জরিপ করে পিলার স্থাপন করা হবে। কারণ আগের পিলার বা মার্কিং হারিয়ে গেছে।’

এদিকে কর্ণফুলী নদীর তীরে প্রথম দফা অভিযানে উদ্ধার হওয়া ১০ একর জমির মধ্যে এক একর চট্টগ্রাম বন্দরের। সেসব ফের অপদখল ঠেকাতে বন্দর কর্তৃপক্ষই দেয়াল নির্মাণ করে দিচ্ছে। শুক্রবার সকালে গিয়ে দেখা গেছে, মাঝিরঘাট এলাকার এভারগ্রিন ঘাট অংশে শ্রমিকরা সিসি পিলার ঢালাই কাজ করছে। শ্রমিক রহিম উল্লাহ বলেন, ‘উচ্ছেদ অভিযান শেষের পরপরই পিলারের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। আশা করি, ১৫ দিনেই দেয়াল উঠে যাবে।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উপব্যবস্থাপক (ভূমি) জিল্লুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া জমির এক-দশমাংশ আমাদের। তাই নতুন করে কেউ যাতে এই জমি দখলে নিতে না পারে সে জন্য বন্দরের টাকায় দেয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে। আমরা ভবিষ্যতে এখানে নদীর ধারে দেয়াল নির্মাণ, প্রয়োজনে ওয়াকওয়ে করে দিব।’

উদ্ধার হওয়া বাকি জমিতে বন্দরের দেয়াল নির্মাণ না করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নদীর জোয়ার থেকে ১৫০ ফুট ভেতরের জমি বন্দরের নিয়ন্ত্রণে থাকে। সেই নিয়ন্ত্রণ রেখায় দেয়াল নির্মাণ করতে হলে জেলা প্রশাসনের সম্মতি লাগবে। তারা প্রস্তাব দিলে বন্দর কর্তৃপক্ষ সেটি বিবেচনায় নিয়ে কাজ করবে।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উদ্ধার হওয়া জমি খাঁ খাঁ করছে। কেউ ভাঙা স্থাপনার লোহা, যন্ত্রাংশ, ইট-কাঠ নিয়ে যাচ্ছে। কেউ দোকান বসিয়ে চা বিক্রি করছে। অন্যদিকে নৌকা থেকে সামুদ্রিক মাছ ও লাইটার জাহাজ থেকে গম, ক্লিংকার, কয়লা খালাস করে নিচ্ছে শ্রমিকরা।

শ্রমিক মোশাররফ হোসেন (৫৫) বলেন, হাবিব গ্রুপের পাশে নালা দিয়ে সদরঘাটের সব নালার পানি এসে কর্ণফুলী নদীতে পড়ে। এখন সময় এসেছে নালাটি সচল করে দেওয়া। এ ছাড়া কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের ভবনের একটি অংশ উচ্ছেদ না হওয়ার সমালোচনা করেন তিনি। জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সকে জমি লিজ দিয়েছে জেলা প্রশাসন। কিন্তু হাইকোর্টের উচ্ছেদের তালিকায় সেটি নেই। তবে লিজটি অবৈধ, কারণ তাতে নিয়ম মানা হয়নি। কিন্তু অভিযান থেকে বাদ পড়ার কারণ প্রতিষ্ঠানটি আগেই উচ্চ আদালতে রিট করে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আসে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যান একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এটি তৈরি করতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগবে। এ দীর্ঘ সময়ের জন্য তো নদীর উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ থাকবে না।’ তিনি প্রশ্ন করেন, ‘ঢাকায় নদীগুলোর উচ্ছেদ অভিযান চললেও চট্টগ্রামে কেন বন্ধ হয়ে গেল, আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। শিগগিরই শুরু করতে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসককে আমি নোটিশ দিচ্ছি।’

নদী রক্ষা কমিশনের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগামী এক বছরের মধ্যে নদীর উভয় পারের সব অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করে সীমানা পিলার দিয়ে দেওয়া হবে। তারপর তা রক্ষায় দুই বছরের স্বল্পমেয়াদি, পাঁচ বছরের মধ্যম মেয়াদি এবং সর্বশেষ ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।’

কর্ণফুলী নদীতে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে উচ্চ আদালতে মামলা করে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ। সংস্থাটির অ্যাডভোকেট মানজিল মোরসেদ বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তালিকায় থাকা দুই হাজার ১২২টি স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। মাস্টারপ্ল্যানের নামে উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। এর আগেও আমরা জেলা প্রশাসনকে আদালত অবমাননার নোটিশ দিয়েছি। এ বিষয়টিও আমরা পর্যবেক্ষণে রাখছি।’

উল্লেখ্য, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন আরএস শিট অনুযায়ী কর্ণফুলীর উভয় তীরের দুই হাজার ১২২টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করে। গত ৪ থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সদরঘাট থেকে আনু মাঝির ঘাট পর্যন্ত অভিযান পরিচালনার পর এখন বন্ধ রয়েছে। অভিযান পরিচালনায় জেলা প্রশাসন এক কোটি ২০ লাখ টাকা চেয়েছিল ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে। তারা পেয়েছে ২০ লাখ টাকা।

আর দ্বিতীয় দফা উচ্ছেদের তালিকায় রয়েছে পতেঙ্গায় বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা, বিভিন্ন আওয়ামী লীগ নেতার দখলে থাকা অন্তত দেড় শ স্থাপনা। তৃতীয় দফা উচ্ছেদের তালিকায় রয়েছে, চাক্তাইয়ের দুই পাশে নদীর তীর দখল করে গড়ে ওঠা বিশাল বস্তি, বন্দরের অনুমোদনকৃত মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র।

মন্তব্য