kalerkantho

যানবাহনের সিএনজি সিলিন্ডার

পুনঃপরীক্ষা হয় খুবই কম, বাড়ছে দুর্ঘটনা

সিএনজি সিলিন্ডার রিটেস্ট করার জন্য আমাদের কাছে কমার্শিয়াল যানবাহন খুবই কম আসে।

শরীফুল আলম সুমন   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যেকোনো যানবাহনে সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস (সিএনজি) সিলিন্ডার সংযোজনের পাঁচ বছর পর পুনরায় পরীক্ষা (রিটেস্ট) করা বাধ্যতামূলক। এমনকি সিলিন্ডার সংযোজনের পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়া গাড়িগুলোর বিআরটিএ ছাড়পত্রের জন্য সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা সনদ (রিটেস্ট সার্টিফিকেট) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সিএনজি সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা হচ্ছে খুবই কম। এতে যানবাহনে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। ভবিষ্যতে আরো বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গত বুধবার রাতে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুরিহাট্টায় ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। এতে পুড়ে মারা যায় অন্তত ৬৭ জন। কেউ কেউ প্রথম থেকেই বলছেন, একটি পিকআপের সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কারণে আগুনের সূত্রপাত। তবে দায়িত্বশীল কোনো সূত্র বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করেনি।

জানা যায়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা থেকে এখন পর্যন্ত ২০ ধরনের নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১৩ লাখ ৭০ হাজার ৫০০টি। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছয় লাখ ১৬ হাজার ৬৪১টি। অর্থাৎ ঢাকায় নিবন্ধিত যানবাহনের মধ্যে সিএনজি দিয়ে চালানোর জন্য রূপান্তরযোগ্য গাড়ির সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত লাখ। সারা দেশে মোট যানবাহনের সংখ্যা ৩৫ লাখের ওপরে। তবে সিএনজিচালিত যানবাহনের মোট সংখ্যা কত সেই হিসাব বিআরটিএর কাছে নেই।

জানা যায়, ২০০২ সাল থেকে রাজধানীতে বাড়তে থাকে সিএনজিচালিত যানবাহনের সংখ্যা। এর পাশাপাশি যানবাহন সিএনজিচালিত করার জন্য রূপান্তর কারখানার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এই সংখ্যা এখন শতাধিক। এ ছাড়া অনুমোদনহীন সিএনজি রূপান্তর কারখানা আছে আরো শতাধিক।

‘গ্যাস সিলিন্ডার আইন ১৯৯১’ অনুযায়ী সিলিন্ডার সংযোজনের তারিখ থেকে পাঁচ বছর পর এর পুনঃপরীক্ষা বাধ্যতামূলক। রাজধানীতে রূপান্তরের কারখানা অনেক থাকলেও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কম্পানি লিমিটেড-আরপিজিসিএল, নাভানা, ইন্ট্রাকো, সাউদার্নসহ কয়েকটি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কেউ সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা করে না।

আরপিজিসিএলের সিএনজি ডিভিশনের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী শুভ বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিএনজি সিলিন্ডার রিটেস্ট করার জন্য আমাদের কাছে কমার্শিয়াল যানবাহন খুবই কম আসে।’

জানা যায়, অনুমোদিত সিলিন্ডার সংযোজন কারখানার পাশাপাশি ঢাকাসহ সারা দেশে রয়েছে অসংখ্য অনুমোদনহীন কারখানা। এসব কারখানায় ব্যবহৃত হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নমানের সিলিন্ডার। অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের সিলিন্ডার, মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার, রেফ্রিজারেটরের সিলিন্ডার বা ধোলাইখালে তৈরি সিলিন্ডার ব্যবহৃত হচ্ছে এসব কারখানায়। ধোলাইখাল, ফুলবাড়িয়া, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী, জুরাইন, মিরপুর, গাবতলীসহ বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই চলছে যানবাহনে সিলিন্ডার সংযোজনের কাজ।

কয়েক বছর আগে বাড্ডায় একটি কাভার্ড ভ্যানের সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণে একজনের মৃত্যু হয়। পরে আরপিজিসিএলের তদন্তে দেখা যায়, স্থানীয়ভাবে তৈরি সিলিন্ডারটির দৈর্ঘ্য ছিল ৮.৫ ফুট এবং ব্যাস ১৬ ইঞ্চি। দুই পাশের মুখ লোহার পাত দিয়ে ওয়েল্ডিং করা। কিন্তু এ মাপের সিলিন্ডার আমদানি করা হয় না। এটা নিম্নমানের স্থানীয় সিলিন্ডার।

জানা যায়, সিএনজি সিলিন্ডারগুলোর প্রতি বর্গইঞ্চিতে তিন হাজার পাউন্ড চাপে যখন গ্যাস ভরা হয় তখন এবং এ গ্যাস বহন করার সময় এটি অত্যন্ত মারাত্মক অবস্থায় থাকে। এ চাপ নিম্নমানের এবং দীর্ঘদিনের ব্যবহৃত সিলিন্ডারের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। আগে সংযোজিত সিলিন্ডারে কোনো ভাল্ব ছিল না। কিন্তু এখন ভাল্ব সংযোজন করায় গাড়ি চালু থাকলে গ্যাস বের হবে এবং বন্ধ থাকা অবস্থায় গ্যাস বের হওয়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। তবে এ ভাল্ব অনেক গাড়ির সিলিন্ডারে না থাকায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে।

নাম প্রকাশ না করে আরপিজিসিএলের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও গাড়ির মালিকদের সচেতনতার অভাবে সবাই এ বিষয়ে অনীহা দেখায়।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বিআরটিএ এ ব্যাপারে আরো ভূমিকা রাখতে পারে। তারা যদি সিএনজি সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষার সনদ ছাড়া যানবাহনকে ছাড়পত্র না দেয়, তাহলে সবাই পুনঃপরীক্ষা করাতে বাধ্য হবে।

মন্তব্য