kalerkantho


স্বজনদের বোধোদয়!

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার ও জাকারিয়া আলফাজ, টেকনাফ   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



স্বজনদের বোধোদয়!

‘তখন সবাই ইয়াবা ব্যবসা করত। পাড়ায় খুব কম পরিবার ছিল যারা ইয়াবা ট্যাবলেটের ব্যবসা করত না। সবাই রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার মতো অবস্থা। নিজেদের গরিব অবস্থা দেখে ছেলেও একসময় এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে টাকার লোভে। অনেক টাকা আয় করেছে। শুধু আমার ছেলে একা নয়, পাড়া-পড়শি সবাই কামাইছে (আয় করেছে)। কেউ কাউকে বাধা দেয়নি সে সময়, তাই আমরাও ছেলেকে বাধা দিইনি। বাধা কেন দেব, পাড়ার সব ভালো মানুষগুলো এ কাজ করেছে। কেউ বলত না যে এটি অপরাধ।’ কথাগুলো বলেন গত শনিবার টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা কারবারি সাবরাং ঝিনাপাড়ার আলী আহমদের স্বজন রুবিনা বেগম।

গত শনিবারের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে দর্শক হয়ে ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে সকাল থেকে গ্রামগঞ্জ থেকে হাজার হাজার লোকের সমাগম হয়। সকাল ১০টার আগেই অনুষ্ঠানস্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। অনেক দর্শক মাঠে ঠাঁই না পেয়ে আশপাশের বিভিন্ন ভবন ও মার্কেটের ছাদে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করে। অনুষ্ঠানে অন্য সবার মতো আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা কারবারিদের পরিবারের সদস্যরাও এসেছিল। তারা হাজার হাজার মানুষের সামনে তাদের ইয়াবা কারবারি স্বজনদের আত্মসমর্পণে অনেকটা লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে পড়েছিল। তাদেরই একজন রুবিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সে সময় আমরা বুঝিনি ইয়াবা ব্যবসা একটি ঘৃণিত কাজ। আজকে মন্ত্রী সাহেবের এবং পুলিশপ্রধানের কথায় আমাদের ঘুম ভেঙেছে। আজ বুঝতে পেরেছি—ইয়াবা ব্যবসায় পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা দিয়ে মারাত্মক ভুল করেছি। ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারের কোনো সদস্যকে ইয়াবার মতো এই ঘৃণিত কাজে জড়াতে দেব না।’

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে ইয়াবা কারবারিদের আবার পুলিশ হেফাজতে নিয়ে যাওয়ার সময় পরিবারের সদস্যরা তাদের একনজর দেখতে ভিড় করে। এ সময় অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়ে। আত্মসমর্পণকারী টেকনাফ পৌরসভার নাইট্যংপাড়ার নুর হাবিবের মা জিন্নাত বেগম এ সময় বলেন, ‘এত মানুষের সামনে ছেলে ইয়াবা কারবারি হিসেবে আত্মসমর্পণ করছে, মা হিসেবে আাামর খুব লজ্জা লাগছে। তবে একটু স্বস্তি পাচ্ছি যে ছেলে এখন থেকে আর ইয়াবা ব্যবসা করবে না।’

টেকনাফ সদর ইউনিয়নের হাতিয়ার ঘোনার বাসিন্দা ইয়াবা কারাবারি মো. হাসানকে দেখতে এসেছিলেন তার স্ত্রী লতিফা বেগম। তিনি বলেন, ‘সবার দেখাদেখি আমার স্বামীও ইয়াবা কারবারে জড়িয়েছিল। ভয় ছিল, ইয়াবা কারবারি স্বামীর কখন কী হয়ে যায়। তবে সরকার তাদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ইয়াবার পথ থেকে ফিরতে যে সুযোগ দিয়েছে তাতে আমরা খুশি।’

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আসা সাবেক স্কুল শিক্ষক ও টেকনাফ উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাস্টার জাহেদ হোসেন বলেন, ‘আজকে আমাদের জন্য একটু স্বস্তি পাওয়ার দিন। ভবিষ্যতে ইয়াবা বন্ধ হোক বা না হোক, এত বড় সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ যে ইয়াবার বিরুদ্ধে জেগেছে সেটাই দেখার বিষয়। এখন আমাদের সবার দায়িত্ব হচ্ছে ইয়াবার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টির মাধ্যমে জনতার এই চেতনা জাগিয়ে রাখা।’ ব্যাংক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আজকের পরও যদি টেকনাফের কোনো মানুষ ইয়াবার সাথে জড়িত হয়ে পড়ে তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক কিছু থাকবে না। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান আমাদের জন্য একদিকে পাপমোচনের, অন্যদিকে লজ্জার।’

অন্যদিকে অনুষ্ঠানে আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির ১৪ স্বজন ছাড়াও আট জনপ্রতিনিধি, সমাজের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তানসহ ১০২ জন ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করেছে। অনুষ্ঠানের শুরু থেকে আত্মসমর্পণকারীদের বেশ বিব্রতকর অবস্থায় দেখা যায়।



মন্তব্য