kalerkantho


সিডও কমিটিতে আলোচনা শুক্রবার

রোহিঙ্গা গণহত্যার তথ্যই তুলে ধরবে বিশ্ব

মেহেদী হাসান   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



গণহত্যা, ধর্ষণের মতো গুরুতর সব অপরাধ অস্বীকার করেও জবাবদিহি এড়াতে পারছে না মিয়ানমার। জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরে আগামী শুক্রবার নারীর প্রতি বৈষম্য নির্মূল কমিটিতে (সিডও) আলোচনায় রোহিঙ্গা নারী ও কন্যাশিশুদের পরিস্থিতি পর্যালোচনার সময় দেশটির বিরুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ, গুমের মতো অভিযোগ তুলতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। সিডও কমিটিতে আলোচনার জন্য আন্তর্জাতিক বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার উত্থাপন করা প্রতিবেদনে এর জোরালো আভাস মিলেছে।

রোহিঙ্গা গণহত্যার প্রাথমিক অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) প্রতিনিধিদল আগামী মাসের প্রথমার্ধে বাংলাদেশ সফর করবে। তার আগে সিডও কমিটিতে আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বের সামনে রোহিঙ্গা নিপীড়নের অভিযোগগুলো নতুন করে উঠে আসবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ধারণা করছেন।

জানা গেছে, রোহিঙ্গা গণহত্যা ও নিপীড়নের জোরালো অভিযোগ তুলে নিউ ইয়র্কভিত্তিক সেন্টার ফর রিপ্রডাক্টিভ রাইটস, গ্লোবাল জাস্টিস সেন্টার, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ফোরটিফাই রাইটস তাদের প্রতিবেদন সিডও কমিটির কাছে জমা দিয়েছে।

গ্লোবাল জাস্টিস সেন্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সবাই সহিংসতার শিকার হয়েছে। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে নতুন করে নিধনযজ্ঞ শুরুর পর মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। তবে তারও এক বছর আগে ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী (তাতমাদো), সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও পুলিশ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে বর্বর সহিংসতা চালানো শুরু করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

গ্লোবাল জাস্টিস সেন্টার বলেছে, নৃশংসতার ক্ষেত্রেও নারী ও কন্যাশিশুরা বিশেষভাবে ভুক্তভোগী। মিয়ানমার বাহিনী রোহিঙ্গাদের নিপীড়ন ও দেশছাড়া করতে নারী ও কন্যাশিশুদের ধর্ষণ করেছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে ধর্ষণই ছিল মিয়ানমার বাহিনীর অন্যতম প্রধান কৌশল। এ ছাড়া হত্যা, যৌন সহিংসতা থেকেও নারীদের রেহাই মেলেনি।

রোহিঙ্গা নারীদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর বর্বরতার উদাহরণ দিতে গিয়ে গ্লোবাল জাস্টিস সেন্টার বলেছে, পাঁচ বছরের কন্যাশিশু এবং গর্ভবতী নারী—কেউই বাদ যায়নি। মিয়ানমার বাহিনী শরীর তল্লাশির নামে তাদের শরীরে হাত দিয়েছে, নির্যাতন চালিয়েছে। রোহিঙ্গা নারীদের স্তন, যৌনাঙ্গ কেটে ফেলেছে মিয়ানমার সেনারা। শুধু যৌন নির্যাতনই নয়, পশুর মতো জবাই ও আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে রোহিঙ্গা নারীদের। গ্লোবাল জাস্টিস সেন্টার বলেছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দেশছাড়া করতে পরিকল্পিতভাবে ছক কষেই মিয়ানমার বাহিনী এসব করেছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিচারব্যবস্থায় এই আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আইসিসি বা তৃতীয় কোনো দেশে মিয়ানমার বাহিনীর বিচারের জন্য যখন তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের উদ্যোগ নিয়েছে তখন এই প্রক্রিয়ার সব ধাপে লিঙ্গভিত্তিক জোরালো বিশ্লেষণ অপরিহার্য।

সেন্টার ফর রিপ্রডাক্টিভ রাইটস তার প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বড় অংশই নারী ও কন্যাশিশু। তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ মিয়ানমার বাহিনীর দ্বারা ধর্ষিত বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।

সেন্টার ফর রিপ্রডাক্টিভ রাইটস নারী ও কন্যাশিশুসহ রোহিঙ্গাদের সবার ওপর নিপীড়ন অবিলম্বে বন্ধ এবং নিপীড়নকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুপারিশ করেছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ফোরটিফাই রাইটসের যৌথ প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্যের উল্লেখ রয়েছে। সংস্থা দুটি মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ ও অন্যান্য সহিংসতা, পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার ও অগ্নিসংযোগের তথ্য লিপিবদ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের হলোকস্ট মিউজিয়াম ও ইয়েল ল স্কুলের অ্যালার্ড কে. লোয়েনস্টেইনের সঙ্গে মিলে ফোরটিফাই রাইটস রোহিঙ্গাদের গণহত্যার শিকার হওয়ার জোরালো তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ফোরটিফাই রাইটস বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকারে মিয়ানমার বাহিনীর ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের তথ্য জানতে পেরেছে। এই সংস্থা দুটি ২০১৭ নভেম্বর মাসে মিয়ানমারের লেফটেন্যান্ট জেনারেল আয়ে উইনের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেছে। ওই প্রতিবেদনে মিয়ানমার বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কোনো প্রমাণ না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ফোরটিফাই রাইটস বলেছে, লেফটেন্যান্ট জেনারেল আয়ে উইনের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর মিয়ানমারের আর কোনো তদন্তে আস্থা রাখা যায় না।

জানা গেছে, আগামী শুক্রবার সন্ধ্যায় জেনেভায় সিডও কমিটির আলোচনায় মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা এসব প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা করবেন। আলোচনা শেষে সিডও কমিটি মিয়ানমারকে বেশ কিছু সুপারিশ করবে। এদিকে আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৪০তম অধিবেশন বসছে। ওই অধিবেশনের শুরুতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসবে। এ ছাড়া মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতিবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ইয়াংহি লি আগামী ১১ মার্চ মানবাধিকার পরিষদে মিয়ানমার বিষয়ে তাঁর প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন।



মন্তব্য