kalerkantho


নাটোরে ফসলি জমি খননের মহোৎসব

নিয়ন্ত্রণে হিমশিম জেলা প্রশাসন

রেজাউল করিম রেজা, নাটোর   

২০ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



নাটোরে ফসলি জমি খননের মহোৎসব

মাছ চাষকে লাভজনক মনে করায় নাটোরের ফসলি জমি নষ্ট করে এভাবে খনন করা হচ্ছে পুকুর। ছবি : কালের কণ্ঠ

নাটোরের সাত উপজেলাতেই তিনফসলি জমিতে অবৈধভাবে পুকুর খনন অব্যাহত রয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, গত চার বছরে জেলায় আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে প্রায় চার হাজার ১৭০ হেক্টর। মাছ চাষকে লাভজনক মনে করায় ফসলি জমি নষ্ট করে দেদার চলছে খননকাজ। এতে বিভিন্ন বিলের পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হওয়ায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ কৃষকরা।

সম্প্রতি জেলা প্রশাসন পুকুর খননের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে খননকাজ বন্ধ করার পাশাপাশি আদায় করা হচ্ছে জরিমানা। জব্দ করা হচ্ছে মাটি কাটার কাজে ব্যবহৃত ভ্যাকু মেশিন। এর পরও থামছে না খননকাজ।

নাটোর কৃষি বিভাগের হিসাবে, ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আবাদি জমিতে পুকুর খনন সহনীয় মাত্রায় ছিল। কিন্তু ২০১২ সাল থেকে এ প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত জেলায় ৯ হাজারেরও বেশি নতুন পুকুর খনন করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নাটোরের বড়াইগ্রামের মৌখাড়া থেকে গুরুদাসপুর উপজেলার চাপিলা পর্যন্ত ১০ কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত চার শতাধিক পুকুর খনন করা হয়েছে। একসময় এসব জমিতে ব্যাপক পরিমাণে রসুনের আবাদ করত কৃষকরা। কিন্তু এখন রসুনসহ অন্যান্য আবাদ বাদ দিয়ে পুকুর খনন করেছে তারা। এ কারণে এলাকায় জলাবদ্ধতা মারাত্মক রূপে দেখা দিয়েছে।

বড়াইগ্রামের জোয়াড়ী এলাকার অবৈধ পুকুর খননকারী খোরশেদ মণ্ডল বলেন, ‘ধান, রসুনসহ অন্যান্য ফসল করে তেমন লাভ হয় না। এ কারণে পুকুর কেটে মাছ চাষের উদ্যোগ নিয়েছি। পুকুর কাটতে কোনো টাকা লাগে না। ইটভাটার মালিকরা ফ্রি পুকুর কেটে দিয়ে যায়। বিনিময়ে তারা কিছু মাটি নেয়।’

গুরুদাসপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেন, আবাদি জমি নষ্ট করে পুকুর কাটার মাধ্যমে কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে চাপিলা ইউনিয়নে প্রায় ৬০০ কৃষিজমি খনন করে পুকুর করা হয়েছে। এতে উঁচু পাড়ের কারণে বর্ষার সময় বৃষ্টির পানি বের হতে না পেরে এলাকার নিচু জমি ও রাস্তায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে।

এ অবস্থায় কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে পুকুর খনন বন্ধে মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসন। গত মঙ্গলবার খননকাজ বন্ধের অভিযানে অংশ নেওয়া অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ড. রাজ্জাকুল ইসলাম পুকুর খননকারীদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আগামীতে নাটোর জেলায় কৃষিজমিতে আর একটিও পুকুর খনন করা যাবে না। যারা এ কাজ করবে তাদের কোনোভাবে ছাড় দেওয়া হবে না।

তিনফসলি আবাদি জমি নষ্ট করে পুকুর খননের বিরুদ্ধে স্বয়ং মাঠে নেমেছেন নাটোরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহরিয়াজ। মঙ্গলবার সকালে তাঁর নেতৃত্বে বড়াইগ্রামের জোয়াড়ী ও গুরুদাসপুরের চাপিলা ইউনিয়নে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আলাদা দুটি অভিযান চালানো হয়। এ সময় জোয়াড়ী থেকে অবৈধভাবে পুকুর খননের অভিযোগে খোরশেদ মণ্ডল নামের এক ব্যক্তিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পরে গুরুদাসপুরের চাপিলা থেকে পুকুর খননের দায়ে দুটি মাটি কাটা মেশিন জব্দের পাশাপাশি আব্দুস সামাদ নামের আরেক ব্যক্তিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এ সময় জেলা প্রশাসক মো. শাহরিয়াজ বলেন, এলাকায় পুকুর খনন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

তবে অভিযানের পরদিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নাটোর সদর উপজেলার রহিম কুড়ি, করোটার বিলসহ বিভিন্ন স্থানে পুকুর খনন চলছে।



মন্তব্য