kalerkantho


বটিয়াঘাটার অচেনা নারীর লাশ উদ্ধার মামলা

ছাত্র-কৃষককে সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার দেখিয়ে নির্যাতন

কৌশিক দে, খুলনা   

২০ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



ছাত্র-কৃষককে সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার দেখিয়ে নির্যাতন

খুলনায় পুলিশি নির্যাতনের শিকার উত্তম মণ্ডলের স্বজনদের আহাজারি। ছবি : কালের কণ্ঠ

চার মাস আগে অচেনা এক নারীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন এক কলেজছাত্র ও কৃষককে গ্রেপ্তারের পর মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ওই দুই ব্যক্তিকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার প্রায় এক দিন পর বিষয়টি স্বীকার করে পুলিশ। ঘটনাটি ঘটেছে খুলনার বটিয়াঘাটার সুরখালী ইউনিয়নের সুখদাড়া গ্রামে। এ ঘটনায় হিন্দু অধ্যুষিত ওই এলাকায় ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

নির্যাতিত দুই ব্যক্তি হলেন সুখদাড়া গ্রামের গৌরপদ মণ্ডলের ছেলে উত্তম মণ্ডল এবং একই গ্রামের সুকুমার সরকারের ছেলে আনন্দ সরকার। আনন্দ স্থানীয় ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহসভাপতি। সরেজমিনে ঘুরে নির্যাতিত ব্যক্তির স্বজন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সান্ত্বনা দিয়েছেন।

গতকাল শনিবার দুপুরে মহানগরী খুলনা থেকে ২৫-৩০ কিলোমিটার দূরের ওই গ্রামে উত্তম মণ্ডলের বাড়িতে পৌঁছলে আতঙ্কিত গ্রামবাসী ঘিরে ধরে। সাংবাদিক শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন উত্তমের মা লক্ষ্মী রানী মণ্ডল, স্ত্রী স্মৃতি মণ্ডল ও একমাত্র মেয়ে জুঁই মণ্ডল।

উত্তম মণ্ডলের মা লক্ষ্মী রানী বলেন, ‘রাতের আঁধারে আমার বাবারে টাইনে ধইরে ওরা ঘর থেকে নিয়্যা গেছে। এক গ্লাস জল খাইতে চালিও খাতি দেয়নি। জিজ্ঞাসা করছি, আপনারা কারা, আমার বাবারে কোথায় নিয়্যা যান? আমি পা জড়াইয়ে ধরি, আমারে লাথি মেরে ফেলে দেয়, মালউনের বাচ্চা বলে গালি দেয়। বলে চুপ চুপ!’

তিনি বলেন, ‘বাবা আমার সারা দিন ধান আনছে, ঠিকমতো খাইতেও পারে নাই। ওরা ১২ জানুয়ারি রাতে তুলে নিয়ে যায়। কিন্তু দুই দিন পর তারা বিষয়টি স্বীকার করে। পুলিশ এমন নির্যাতন করছে; এখন ঠিকমতো হাঁটতেও পারে না।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে উত্তমের স্ত্রী স্মৃতি মণ্ডল বলেন, ‘মেয়েডা একটু কিছু খাইছে না। স্কুলে যায়। ওর বাবারে না পাইলে ও কিছু করবে না। আমি এখন কী করব? আমার স্বামীরে পুলিশ যে নির্যাতন করছে তা সহ্য করা যাচ্ছে না। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।’

উত্তম মণ্ডলের বাড়ির এক-দুই কিলোমিটার দূরে কলেজছাত্র আনন্দ সরকারের বাড়ি। বিকেল ৩টার দিকে সেখানে পৌঁছলেও একই দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। আতঙ্কের মধ্যেও ক্ষোভে ফুঁসছে সাধারণ মানুষ।

আনন্দের বাবা সুকুমার সরকার ও মা সুষমা সরকারের কান্না কোনোভাবেই থামছে না। ছেলেকে নির্যাতনের বর্ণনা করতে করতে খেই হারিয়ে ফেলছেন। মা সুষমা বলেন, ‘যেই ছেলের গায়ে নখের টোকা দেইনি; তারেও ওরা এভাবে কেমনে নির্যাতন করতে পারল। আমার ছেলে কী অপরাধ করছে? আমি এর বিচার চাই। আমরা কি শুধু নির্যাতন সইব?’

বাবা সুকুমার সরকার বলেন, ‘আমি সারা বছর বিভিন্ন জায়গায় দিনমজুরি করি। বাড়িতেও থাকি না। পরের জমিতে কাজ কইরে খাই। আমরা কি মানুষ না? আজ ছাত্রলীগ কইরেও সে রক্ষা পাইলে না। আমরা কোথায় যাব?’

উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মিজানুর রহমান মিজান বলেন, ‘গ্রেপ্তারের পর ওই দুজনকে এমন নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা বর্ণনা করা যায় না। তাদের বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করে। শরীরের স্পর্শকাতর স্থানও এ নির্যাতন থেকে বাদ যায়নি। তাদের মাথার চুলও উপড়ে ফেলার চেষ্টা হয়। এখন তারা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। প্রস্রাব করতে গেলে রক্ত বের হয়। এটা দুঃখজনক।’ 

থানা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বটিয়াঘাটার টেংরামারী এলাকা থেকে ২২ বছরের অচেনা নারীর লাশ উদ্ধার হয়। সে সময় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়। ওই ঘটনার প্রায় চার মাস পর এসআই জয়ন্ত কুমার হোড় ৯ জানুয়ারি বটিয়াঘাটা থানায় মামলা করেন। এই মামলায় গত ১৪ জানুয়ারি রাতে পানখালী ফেরিঘাট এলাকা থেকে উত্তম মণ্ডল ও আনন্দ সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁদের আদালতে হাজির করে তিন দিনের রিমান্ডে আনা হয়। এক দিন জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

অবশ্য পুলিশ পানখালী এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের কথা বললেও গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের স্বজন ও প্রতিবেশীরা বলেছে, পুলিশ ১২ জানুয়ারি গভীর রাতে দুজনকে বাড়ি থেকে তুলে আনে। পরে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের দুই দিন পর তাঁদের গ্রেপ্তার দেখায়।

অভিযোগ প্রসঙ্গে পিএসআই শেখ আহম্মদ কবির বলেন, উত্তম মণ্ডল ও আনন্দকে বাড়ি থেকে নয়, পানখালী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের নির্যাতনের অভিযোগও ঠিক নয়।

নারীর লাশ উদ্ধারের চার মাসে পরিচয় শনাক্ত না হওয়ার পরও কিভাবে সন্দেহভাজন হত্যাকারী শনাক্ত হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওই নারীর লাশ উদ্ধারের সময় ইউডি মামলা ছিল। পরে এটি হত্যা মামলা হয়েছে। তাদের সন্দেহজনকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’



মন্তব্য