kalerkantho


ময়মনসিংহ-৪

লাঙল-ধানের শীষে মর্যাদার লড়াই

রওশনের পাশে আওয়ামী লীগ

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ময়মনসিংহের আদালতপাড়ায় একজন স্বনামধন্য আইনজীবীর চেম্বার। সেখানে শীতের দুপুরে খোশগল্পে মশগুল জনাবিশেক বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আলাপের একপর্যায়ে উঠল সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গ। জেলার বিভিন্ন আসন নিয়ে আলোচনার পর আলোচনা এসে ঠেকল সদর আসনে। একজন জুনিয়র আইনজীবী বললেন, এবারের নির্বাচনে সদরে কে জিতবে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না। এক ব্যবসায়ী বললেন, ‘লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। এ আসনে বিএনপির ভালো ভোট আছে। প্রার্থীও শক্তিশালী। তাই দলটি অবশ্যই ভালো ভোট পাবে। আবার রওশন এরশাদও এখন জাতীয় ব্যক্তিত্ব। এলাকায় তাঁর কোনো বদনাম নেই। তিনি কারো ক্ষতি করেননি। আওয়ামী লীগ পাশে থাকলে রওশন এরশাদও ভালো ভোট

পাবেন। তবে শেষ হাসি কে হাসবেন তা জানতে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’ এই ব্যবসায়ীর কথায় সায় দিলেন অন্যরাও।

এই আইনজীবীর চেম্বারে গল্পে গল্পে উঠে আসা এসব কথা আসলে সদর আসনের (ময়মনসিংহ-৪) নির্বাচনী পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ। মর্যাদার এ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে ধানের শীষ আর লাঙল প্রতীকের মধ্যে।

আসনটি জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন। এ আসনে ভোটারসংখ্যা পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার ৮৭৮ জন। প্রার্থী হয়েছেন পাঁচজন। তাঁরা হলেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বেগম রওশন এরশাদ (লাঙল), বিএনপির আবু ওয়াহাব আকন্দ (ধানের শীষ), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) এমদাদুল হক মিল্লাত (কাস্তে), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. নাসির উদ্দিন (হাতপাখা) ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. হামিদুল ইসলাম (আম)।

এবারের নির্বাচনে ময়মনসিংহ-৪ আসন থেকে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ প্রার্থী হবেন—এটা নিশ্চিত ছিল অনেক আগে থেকেই। সেদিক থেকে ভোটারদের মাঝে তিনি আগে থেকেই প্রার্থী হিসেবে আলোচিত। তিনি এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্যও। বিএনপি থেকে একাধিক নেতা দলের প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছিলেন। আলোচনায় ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, দলের জেলা (দক্ষিণ) শাখার সাধারণ সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দ ও সাবেক সংসদ সদস্য দেলোয়ার হোসেন খান দুলু। শেষ পর্যন্ত ধানের শীষ প্রতীক পান আবু ওয়াহাব আকন্দ।

ভোটারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, রওশন এরশাদের বাড়ি সদর উপজেলার সুতিয়াখালী এলাকায়। ওই এলাকাসহ ময়মনসিংহ শহরতলি ও সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে তাঁর ভোটব্যাংক আছে। এ ছাড়া ব্যক্তি হিসেবে রওশন এরশাদ তাঁর অবস্থান আগের চেয়ে কিছুটা হলেও শক্ত করতে পেরেছেন। বর্তমানে তিনি সংসদ সদস্য থাকলেও তাঁকে নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মাঝে কোনো সমালোচনা নেই। প্রশাসনে তিনি কোনো প্রভাব বিস্তার করেননি। দলীয় নেতাকর্মীরাও রওশন এরশাদের নাম ব্যবহার করে বড় কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি করতে পারেনি। এসব কারণে রওশন এরশাদ সাধারণ ভোটারদের সমর্থন পাবেন বলে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা আশা করছে।

বিএনপি প্রার্থী আবু ওয়াহাব আকন্দ দলের একজন ত্যাগী, পুরনো ও নিবেদিতপ্রাণ নেতা। জেলায় জনপ্রিয় সাবেক এ ছাত্রদল নেতা ছাত্রজীবন থেকেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। মূল শহরে ভালো একটা অবস্থান আছে তাঁর। কঠিন সময়ে দলের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি দলের নেতাকর্মীদের কাছে আস্থাভাজন। এবারের নির্বাচনে ধানের শীষের প্রতীক পাওয়া এই প্রার্থী ভোটারদের কাছেও আলোচিত। প্রচার-প্রচারণায় ধানের শীষ এখনই মাঠ গরম করে ফেলেছে।

ভোটারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এই আসনে আওয়ামী লীগও একটা বিরাট ফ্যাক্টর। দলটির আছে বিশাল ভোটব্যাংক। আছেন প্রভাবশালী একাধিক নেতা। দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা রওশন এরশাদের পক্ষে সক্রিয়ভাবে মাঠে নামলে লাঙলের জয় সহজ হবে বলে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা আশা করছে। লাঙলের জন্য সুখবর হলো—জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যেই মাঠে নেমেছে। আওয়ামী লীগ সভা-সমাবেশ করে লাঙলের পক্ষে ভোট চাইতে পুরোপুরি প্রস্তুত।

দলগুলোর ভোটের প্রস্তুতি চললেও প্রচারণায় এখনো তেমন জোয়ার আসেনি। মিছিল-সমাবেশ হচ্ছে টুকটাক। পোস্টারও তেমন লাগানো হয়নি। মাইকিংও তেমন চোখে পড়ে না।

এ ব্যাপারে বিএনপির একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, বিজয় দিবসের পরপরই তাঁরা জোরালোভাবে মাঠে নামবেন। প্রায় একই কথা জানা গেল জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে।

ভোট নিয়ে সাধারণ মানুষ কী ভাবছে? এর উত্তর পেতে শহরের আকুয়া এলাকায় কথা হয় একজন রিকশাচালকের সঙ্গে। হাশিম মিয়া নামে ওই রিকশাচালক বলেন, তাঁদের এলাকায় লোকজন এখনো কাকে ভোট দিবে তা ঠিক করেনি।

শহরের সানকিপাড়া এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইনছান আলী বলেন, তাঁর বাসায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—দুই দলেরই ভোট আছে। এলাকাতেও একই অবস্থা।

নারীরা কি ভাবছে? এমন আগ্রহ থেকে কথা হয় নওমহল এলাকার গৃহিণী সালমা খাতুনের সঙ্গে। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, নারী হিসেবে রওশন এরশাদের প্রতি তাঁর দুর্বলতা আছে। তবে নারীদের মাঝেই পাওয়া গেল ধানের শীষের সমর্থক। আবার কেউবা নৌকার সমর্থক।

নতুন ভোটাররা কী ভাবছে? জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক তরুণ ভোটার বলল, এখনই তারা কোনো দলের লোক হিসেবে চিহ্নিত হতে চায় না। তবে তারা ভেবেচিন্তেই ভোট দেবে।

অটোরিকশাচালক ইলিয়াস মিয়া বললেন, তিনি শান্তি চান। যারা দেশ শান্তিতে রাখবে তিনি সে পক্ষেই ভোট দিবেন। তবে আরেক চালক রফিক আলীর আক্ষেপ, এবার এ আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী নেই। নৌকা থাকলে তিনি সবার আগে গিয়ে নৌকায় ভোট দিতেন।



মন্তব্য