kalerkantho


কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে জঙ্গিবিরোধী অভিযান

১০ জনকে অভিযুক্ত করে মামলার চার্জশিট প্রস্তুত

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১০ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রাজধানীর কল্যাণপুরে জাহাজবাড়িতে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলার অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিটিসি)। অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে ১০ জনকে। এর মধ্যে তিনজন পলাতক।

আগামী সাত দিনের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হতে পারে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সিটিটিসি সূত্র জানিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটিটিসির উপকমিশনার (ডিসি) মহিবুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই মামলার চার্জশিট প্রস্তুত করে গত বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পেলেই চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হবে।’

প্রায় আড়াই বছর তদন্তের পর এই ঘটনায় জড়িত ২৪ জনের নাম পাওয়া যায়। ঘটনার সময় ৯ জনসহ ১১ জন নিহত হয়েছে। আরো তিনজনের নাম পাওয়া গেলেও তাদের বিস্তারিত পরিচয় না জানায় অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে পরে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। বাকি ১০ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সাতজনকে। তারা সবাই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ২৫ দিনের মাথায় ২৬ জুলাই কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অপারেশন স্টর্ম-২৬ নামের পুলিশের ওই অভিযানে ৯ জঙ্গি মারা যায়। ঘটনাস্থল থেকে রাকিবুল হাসান রিগ্যান নামে এক জঙ্গিকে জীবিত গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় মোট সাতজনকে এজাহারভুক্ত আসামি করে পুলিশ বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে রাজধানীর মিরপুর থানায় একটি মামলা করে।

অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিদের মধ্যে যারা কারাগারে রয়েছে তারা হলো রাকিকুল হাসান রিগ্যান (২১), সালাহ্ উদ্দিন কামরান (৩০), আব্দুর রউফ প্রধান (৬৩), আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আবু জাররা (২০), মুফতি মাওলানা আবুল কাশেম ওরফে বড় হুজুর (৬০), আব্দুস সবুর খান হাসান ওরফে সোহেল মাহফুজ ওরফে নাসরুল্লা হক ওরফে মুসাফির ওরফে জয় ওরফে কুলমেন (৩৩) ও হাদিসুর রহমান সাগর (৪০)। আর পলাতক তিনজন হলো মামুনুর রশিদ রিপন ওরফে মামুন (৩০), আজাদুল কবিরাজ ওরফে বিপ্লবী ওরফে হার্টবিট (২৮) ও শরীফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ওরফে সোলায়মান (২৫)।

এ ছাড়া ইকবাল, জুনায়েদ খান ও বাদল নামের তিনজনের নাম জানা গেছে। তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত আর কিছু জানা যায়নি। জানা গেলে তাদের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

সিটিটিসির একজন সহকারী কমিশনার কালের কণ্ঠকে বলেন, কল্যাণপুরে জাহাজবাড়ি আস্তানায় বসে রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসী পরিকল্পনা করলেও ঘটনার সময় ৯ জন এবং পরে নারায়ণগঞ্জে তামিম চৌধুরী ও আশুলিয়ায় সরোয়ার জাহান নিহত হয়। এ কারণে মামলা থেকে এই ১১ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বাকি ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

গতকাল রবিবার সিটিটিসির এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া মামলার অভিযোগপত্র আদালতে পেশ করার আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হয়। গত ৫ ডিসেম্বর অনুমোদনের জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে অভিযোগপত্রটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন বিভাগ সিটিটিসির জমা দেওয়া অভিযোগপত্রের খুঁটিনাটি বিষয় যাচাই-বাছাই করে দেখেছে। দু-এক দিনের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন মিলতে পারে। এর পরই তা আদালতে পেশ করা হবে।

অভিযোগপত্রের বরাত দিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট সিটিটিসির এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, কল্যাণপুরের আস্তানাটি মূলত ব্যবহার হয়েছিল জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প হিসেবে। গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার পরে তারা আরো ভয়াবহ হামলার প্রশিক্ষণ নিতেই ওই বাড়িটি আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করেছিল। বিচ্ছিন্নভাবে পরস্পর যোগসাজশে দেশের বিভিন্ন এলাকাসহ কূটনৈতিকপাড়ায় ফের হামলার চিন্তা-ভাবনা করেছিল জঙ্গিরা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই জঙ্গি আস্তানায় অবস্থানকারী ও যাতায়াতকারীরা দেশে খেলাফত বা কথিত শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করে অগ্রসর হচ্ছিল। তারা নিজেদের নতুন ধারার জঙ্গি ‘নব্য জেএমবি’ পরিচয় দিত। দীর্ঘ পরিকল্পনার পর গুলশানের হলি আর্টিজানে ঢুকে দেশি-বিদেশি নাগরিকদের আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো ছুরির আঘাতে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল তারা। এই ভয়াবহ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে এই মামলার আসামিরা বাংলাদেশের সংহতি, জননিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন ও বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে চেয়েছিল।

জাহাজবাড়িতে জঙ্গিদের অবস্থান নিশ্চিত হতে শুরুতে গোয়েন্দা ব্যর্থতা থাকলেও দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর কঠোর অভিযান চালিয়ে সফলতা আসে। সেখানে ৯ জন জঙ্গি সদস্য নিহত হয়। কল্যাণপুরের ওই আস্তানায় নিহতদের মধ্যে এমন অন্তত পাঁচজন ছিল, যারা হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁর মতো আরেকটি হামলার জন্য কঠোর জঙ্গি প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি নিয়েছিল। অভিযানের পর আস্তানা থেকে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের মতো পতাকাসংবলিত জঙ্গিদের ছবিও উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনার পর জঙ্গিরা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর নারায়ণগঞ্জের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে জঙ্গিগোষ্ঠীটির দলনেতা তামিম চৌধুরী ও আশুলিয়ায় সরোয়ার জাহান নিহত হলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।



মন্তব্য