kalerkantho


ভোটের ইশতেহারে শিক্ষকরা চান সব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ ঘোষণা

প্রাথমিক শিক্ষকদের দাবি গ্রেড বৈষম্য দূরীকরণ

শরীফুল আলম সুমন   

২১ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



দেশে সরকারি বেতন ভাতাপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৯ লাখের ওপরে। এ ছাড়া নন এমপিও রয়েছেন আরো প্রায় এক লাখ শিক্ষক। সব মিলিয়ে পেশাজীবীদের মধ্যে শিক্ষকের সংখ্যাই বেশি। গ্রামগঞ্জ থেকে শুরু করে সব জায়গায়ই বিশেষ মর্যাদা পান শিক্ষকরা। লোকজন শিক্ষকদের কথাকে আলাদা গুরুত্ব দেন। তাই সব সরকারই শিক্ষকদের দাবিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা কনে। যে দলই আগামী সরকার গঠন করুক, তাদের কাছে এবার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবি তুলেছেন শিক্ষকরা।

গত ১০ বছর ক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার। ইতিমধ্যে তারা একযোগে ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ, প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা প্রদান, সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়ে নতুন করে পদ সৃষ্টি, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নতুন বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্তকরণ এবং সব শেষ ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখী ভাতা প্রদানসহ বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শিক্ষা খাতে অগ্রগতির কারণেই এমডিজির লক্ষ্য পূরণে সরকারকে বেগ পেতে হয়নি। ফলে বাংলাদেশ ২০৪১ সালে উন্নত দেশের কাতারে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তবে এসডিজির লক্ষ্য পূরণ করতে হবে। এতে শিক্ষা খাতকে আবারও বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। তাই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে শিক্ষকদের দাবি পূরণের বিষয়টিও সরকারের অন্যতম ভাবনার বিষয়।

বাংলাদেশ শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের প্রধান সমন্বয়কারী মো. নজরুল ইসলাম রনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান সরকারের সময়েই আমাদের একাধিক দাবি পূরণ হয়েছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। তবে আগামীতে আমাদের একমাত্র দাবি শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ঘোষণা দেখতে চাই।’

মিরপুর ‘সিদ্ধান্ত হাই স্কুলের’ এই প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘সরকারের পক্ষে হয়তো একবারে সব শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ সম্ভব নয়। এটা আমরা বুঝি। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে তো তেমন কোনো সমস্যা নেই। প্রয়োজনে ধাপে ধাপে শিক্ষকদের চাকরি সরকারি করতে হবে। এখন সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শতভাগ মূল বেতন দেয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ সরকারি হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় সরকারকে খুব বেশি খরচ করতে হবে না।’

২০১৩ সালে সরকার একযোগে প্রায় ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করে। যা সরকারের একটি বড় অর্জন। একই সঙ্গে প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদাও দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়েছে। তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এখন তাঁদের গ্রেড বৈষম্যের নিরসন চান। প্রধান শিক্ষকরা দশম গ্রেডে বেতন চান। আর সহকারী শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষকদের এক ধাপ নিচের গ্রেডে বেতন চান। সরকারও শিক্ষকদের এসব দাবি পূরণে কাজ শুরু করেছে বলে জানা যায়।

সরকারি চাকরিজীবীদের মতো এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নতুন বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করলেও এত দিন বৈশাখী ভাতা ও বার্ষিক ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়নি। কিন্তু গত ৮ নভেম্বর শিক্ষকদের এই দুটি দাবিও পূরণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অপেক্ষমাণ যত পদোন্নতি ও নিয়োগ ছিল তা নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগেই শেষ করা হয়েছে। শিক্ষা ক্যাডারে পদ না থাকার পরও অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপক পদে রেকর্ডসংখ্যক পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন পর সহকারী শিক্ষকদের সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। সরকারি মাধ্যমিকে সিনিয়র শিক্ষক নামে একটি পদও সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষকের পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০১৩ সালের পর থেকে এমপিও বন্ধ থাকা অতিরিক্ত শ্রেণি শাখার শিক্ষক এবং আইসিটি বিষয়ের শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির বাধা দূর করা হয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদেরও সুবিধা দিতে কার্পণ্য করেনি সরকার। অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দিয়ে নির্বাচনের আগেই ২৮ হাজার শিক্ষকের পাওনা অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় এ সমস্যা সমাধানে ৭৫৭ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সরকার বিমুখ করেনি বেসরকারি মাদরাসা শিক্ষকদেরও। প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের পর স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষকরাও জাতীয়করণের দাবি তুলেছেন। কিন্তু এত দিন তাঁদের কোনো নীতিমালাই ছিল না। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা নীতিমালা-২০১৮-এর অনুমোদন দিয়েছেন। ফলে শিগগিরই তাঁরাও একটি কাঠামোর মধ্যে আসবেন বলে জানা গেছে।

তবে ২০১০ সালের পর থেকে নতুন করে আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করেনি সরকার। ফলে কয়েক বছর ধরে বেসরকারি শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির আন্দোলন ছিল তুঙ্গে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন এমপিও নীতিমালা জারি করেছে। এই নীতিমালার আওতায় নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আবেদনও করেছে। কিন্তু কবে সরকার নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করবে সে বিষয়টি এখনো জানা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রায় সাত হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী মনঃকষ্টে আছে।

তবে সরকার নতুন এমপিওভুক্তি না করলেও জাতীয়করণ বন্ধ থাকেনি। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, প্রতিটি উপজেলায় একটি করে স্কুল ও কলেজ জাতীয়করণ শেষের পথে। গত পাঁচ বছরে সরকার পাঁচ শতাধিক স্কুল-কলেজ জাতীয়করণ করেছে।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক মো. কাওছার আলী শেখ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের একমাত্র দাবি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ। সরকার আমাদের শতভাগ মূল বেতন দিচ্ছে। এখন শুধু বাড়িভাড়া দিলেই হয়ে যায়। তাই আমরা চাইব, রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে যেন জাতীয়করণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকে।’



মন্তব্য