kalerkantho


প্রত্যাবাসন নিয়ে কূটনৈতিক ব্রিফিং

রোহিঙ্গা নেতাদের রাখাইন সফর করিয়ে আস্থা সৃষ্টির পরিকল্পনা

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১৬ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পর এবার রোহিঙ্গা নেতাদের সাময়িকভাবে মিয়ানমারের রাখাইনে পাঠিয়ে আস্থা সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে সরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় নির্বাচন ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে বিদেশি কূটনৈতিক মিশনগুলোর প্রধানদের ব্রিফ করার পর সাংবাদিকদের এ কথা জানান। তিনি বলেন, জাপান এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশও এ নিয়ে পরিকল্পনা করছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) সুনির্দিষ্টভাবে বলেছে যে রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেখানে পরিস্থিতি সরেজমিনে গিয়ে দেখার সুযোগ পাওয়া উচিত। সার্বিক দিক বিবেচনায়, আশ্রিত সব রোহিঙ্গার সেখানে পরিদর্শন করার সুযোগ পাওয়া কঠিন। এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা নেতাদের (মাঝি) রাখাইনে পরিদর্শনে পাঠানো হলে তারা সেখানকার পরিস্থিতি দেখে এসে অন্য রোহিঙ্গাদের জানাতে পারবে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমার গত ৩০ অক্টোবর ঘোষণা করেছিল, ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হবে। কিন্তু প্রত্যাবাসনের তালিকায় থাকা রোহিঙ্গারা এখনই ফিরতে আগ্রহী নয়। অন্যদিকে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ফিরতে আগ্রহী এমন তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব পালনকারী ইউএনএইচসিআর তাদের কাজ শেষ করতে পারেনি। প্রত্যাবাসনের নির্ধারিত তারিখের মাত্র এক দিন আগে গত বুধবার তারা কাজ শুরু করেছে। অথচ বাংলাদেশ সরকার তাদের প্রত্যাবাসনের তালিকা দিয়েছে গত ২৮ অক্টোবর। তালিকা পাওয়ার পরও ইউএনএইচসিআর কেন দেরিতে কাজ শুরু করল, সেই বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এ প্রশ্ন ইউএনএইচসিআরকে করুন।’

প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত করেনি—এমন প্রচারণা নাকচ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সব সময় জাতিসংঘের সঙ্গে আলোচনা করছে ও যোগাযোগ রাখছে।

জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় গতকালের কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সংলাপ ছাড়াও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে জটিলতা, মিয়ানমারে পরিবেশ সৃষ্টিসহ এ সংকটের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ের পর ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা সাংবাদিকদের বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী কূটনৈতিক কোরকে আগামী নির্বাচনের প্রাক্কালে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে নেওয়া উদ্যোগ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া নিয়ে ব্রিফ করেছেন। তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন একটি জটিল প্রক্রিয়া। ভারত রাখাইনের বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নিরাপদ, দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবর্তন চায়। যথাযথ প্রক্রিয়ায় এ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করবে। রোহিঙ্গাদের জন্য ভারত মিয়ানমারের রাখাইনে বাড়ি নির্মাণ করছে এবং এ দেশে আশ্রিতদের জন্য তিন দফায় মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছে। ভারতীয় হাইকমিশনার প্রত্যাবাসন পরিকল্পনাকে চলমান উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ভোটের নতুন তারিখ জানানোর পাশাপাশি তফসিল ঘোষণার আগে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং কতক্ষণ আলোচনা করেছেন, তারও একটি তালিকা তিনি কূটনীতিকদের দিয়েছেন। বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় আলোচনার কথাও তিনি জানিয়েছেন।

কূটনীতিকদের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মনে হয়, সবাই খুব সন্তুষ্ট যে এটি (উদ্যোগ) এগিয়ে চলেছে। গতকাল (বুধবার) একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। সেটি সম্পর্কেও মোটামুটি সবাই জানে।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের প্রথম দলের ফেরত যাওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশ কখনো জোর করে ফেরত পাঠানোর পক্ষে নয়, সব সময় শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের পক্ষে ছিল। এখনো আছে। বাংলাদেশ সেটিই চেষ্টা করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভারত ও চীনকে রোহিঙ্গাদের এলাকাগুলোতে বাড়ি নির্মাণ করতে অনুরোধ করেছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে না পারা সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা ফিরতে চাচ্ছে না। এখানে নানা বিষয় কাজ করছে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ জোর করে ফেরত পাঠাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ কেন জোর করে ফেরত পাঠাবে? আমরা চাইলে তো আগেই তাদের আটকে দিতে পারতাম (সীমান্তে)।’

অন্যদিকে গতকাল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন উদ্যোগের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা বিবৃতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা, শরণার্থী ও অভিবাসনবিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি রিচার্ড অলব্রাইটের গত ১০ থেকে ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশ সফর প্রসঙ্গে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস বলেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসন শুরু করার বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের যৌথ পরিকল্পনার ওপর ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখছে। আমরা ইউএনএইচসিআরের মূল্যায়নের সঙ্গে একমত যে মিয়ানমারের পরিস্থিতি এখনো শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের জন্য পুরোপুরি অনুকূল নয়।’

ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিষয়ক মন্ত্রী মার্ক ফিল্ড প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ জানান। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন মন্ত্রী ম্যারি ক্লদ বিবেও প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা উদ্বেগ জানিয়ে একে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, টেকসই, সম্মানজনক ও মানবাধিকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হওয়ার ওপর জোর দেন। নিউ ইয়র্কভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও গতকাল প্রত্যাবাসন উদ্যোগ স্থগিত রাখার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দেয়।



মন্তব্য