kalerkantho


কর্মশালায় মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা

আত্মহত্যার সংবাদ যেন প্ররোচিত না করে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



আত্মহত্যার সংবাদ যেন প্ররোচিত না করে

আত্মহত্যার খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের করণীয় বিষয়ে গতকাল কালের কণ্ঠ’র কর্মীদের নিয়ে কর্মশালা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। ছবি : কালের কণ্ঠ

আত্মহত্যায় উৎসাহিত হয়—এমনভাবে সংবাদ উপস্থাপন না করতে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, আত্মহত্যার প্রতিবেদন সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় বা খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রকাশ করা সমীচীন নয়। শিরোনামে এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করা ঠিক নয়, যা পাঠক বা দর্শককে উদ্দীপনার খোরাক দেয়। তা ছাড়া কোনো তারকার আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

গতকাল রবিবার বিকেলে কালের কণ্ঠ’র কনফারেন্স রুমে আয়োজিত ‘ওয়ার্কশপ অন রেসপনসিবল রিপোর্টিং অব সুইসাইড ফর মিডিয়া প্রফেশনালস’ শীর্ষক কর্মশালায় এ অভিমত উঠে আসে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে। এতে উপস্থিত ছিলেন কালের কণ্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা কামাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ক্লিনিক্যাল শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল, কালের কণ্ঠ’র উপসম্পাদক টিটু দত্ত গুপ্ত, বার্তা সম্পাদক খায়রুল বাশার শামীম, অতিরিক্ত বার্তা সম্পাদক কাজী মো. মোতাহার হোসেন (বুলবুল), যুগ্ম সম্পাদক মো. হুমায়ূন কবীর, প্রধান প্রতিবেদক আজিজুল পারভেজসহ রিপোর্টিং ও বার্তা বিভাগের কর্মীরা।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক  ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রকল্প ব্যবস্থাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ ও বারডেম হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. নাসিম জাহান। সঞ্চালনা করেন কালের কণ্ঠ’র উপপ্রধান প্রতিবেদক তৌফিক মারুফ।

কালের কণ্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক ও বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘কালের কণ্ঠ সব সময়ই সমাজ ও মানুষের কল্যাণকর নানা উদ্যোগে ভূমিকা রাখে। নতুন প্রজন্মের মাঝে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে আমরা কাজ করে থাকি। আমরা খবর, ফিচার কিংবা নিবন্ধ প্রকাশের ক্ষেত্রেও অধিকতর সতর্ক ও সচেতন থাকার চেষ্টা করি। এমন ভূমিকার অংশ হিসেবেই আত্মহত্যার প্রতিবেদনের ধরন কেমন হওয়া উচিত—এ বিষয়ক কর্মশালায় আমরা যুক্ত হয়েছি।’

লেখক ও মনোরোগ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, ‘আমরা যদি মনকে চিনতে পারি তা হলে বুঝব মন কিভাবে আক্রান্ত হয়। যদি বুঝতে পারি আমার পরিচিত বন্ধুর মন আক্রান্ত হয়েছে তাহলে তার পাশে দাঁড়াতে হবে। মন আক্রান্ত ব্যক্তির পাশে দাঁড়ালে আত্মহত্যা রোধ করা সম্ভব। আত্মহত্যার প্রবণতা আছে—এমন ব্যক্তিকে চিকিৎসকের কাছে নিলে সমাধান অবশ্যই মিলবে। এ কারণে মনের ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

কর্মশালার মূল প্রবন্ধে ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, মন একেকজনের কাছে একেকরকম। আমরা বলি মন নদীর মতো। নদীতে যেমন চর পড়ে, তেমনই মনেও চর পড়ে। নদীর মতো মনেও ভাঙন দেখা দেয়। এই মনের বিক্ষিপ্ততার কারণেই মানুষ আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়। সাধারণ লোকজন অন্য সব বিষয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেও, মনের চিকিৎসকের কাছে যেতে চায় না।

ডা. হেলাল উদ্দিন পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে গায়ানায়। এরপর উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও লিথুনিয়ার অবস্থান। বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ২৮ জন আত্মহত্যা করে। বেশির ভাগের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছর। বর্তমানে দেশে ৬৫ লাখ মানুষ আত্মহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছে, যার প্রায় ৮৯ শতাংশই নারী।

ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, যৌতুক, পারিবারিক নির্যাতন, দাম্পত্য কলহ, সম্পর্কের জটিলতা, উত্ত্যক্ত, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, প্রেম, পরীক্ষায় ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকট ইত্যাদি কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। এ পরিস্থিতি উত্তরণে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আত্মহত্যার উপকরণের সহজপ্রাপ্তি হ্রাসকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর প্রতি বিশেষ সহায়তা, সামাজিক বন্ধন দৃঢ়করণ, নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

গণমাধ্যমে আত্মহত্যার সংবাদ উপস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংবাদ এমনভাবে প্রকাশ করা যাবে না যে আত্মহত্যা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। আত্মহত্যার সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনকারী গণমাধ্যমকর্মী নিজেও আত্মহত্যার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। আত্মহত্যার ঘটনায় মৃতের দেহের ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা উচিত নয়। তা ছাড়া কিভাবে একজন আত্মহত্যা করেছে বা করার চেষ্টা করেছে, এমন বিষয়ের বিশদ বিবরণ থাকা সমীচীন নয়। কারণ এ ধরনের বিবরণ অন্য কাউকে আত্মহত্যার দিকে উৎসাহ জোগাতে পারে।



মন্তব্য