kalerkantho


‘ভালসারটান’ ওষুধ নিয়ে জটিলতা

সেবনকারীদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের

তৌফিক মারুফ   

১৭ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের রোগীদের জীবনরক্ষাকারী বহুল প্রচলিত ও কার্যকর ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হওয়া ভালসারটান নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ভালসারটান ও এর সঙ্গে যুক্ত অ্যামলোডিপিন জেনেরিকের কিছু ব্যাচের ওষুধ বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। নির্দিষ্ট ছয়টি দেশীয় প্রতিষ্ঠানের একই ওষুধের ২০ ধরনের ব্র্যান্ড আইটেম উৎপাদন, বাজারজাত নিষিদ্ধ করে বাজার থেকে ওই ওষুধ প্রত্যাহারের জন্য গত রবিবার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে কেবল চীন থেকে আনা কাঁচামাল দিয়ে তৈরি ওষুধের কথা বলা হয়েছে।

এর আগে গত ২২ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করে ভালসারটান ওষুধ নিষিদ্ধ করে। এ ছাড়া ওই ব্যাচগুলো খুঁজে বের করতে একটি কমিটি করে দেয়। সেই কমিটির সুপারিশ অনুসারেই ভালসারটান ওষুধ নিষিদ্ধ করা হয়। সেই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুসারে ভালসারটানের কাঁচামাল যাতে অন্য কোনো ওষুধে ব্যবহার করা না হয় সেদিকে সতর্ক থাকার জন্য বলা হয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের প্রায় দুই মাস পরে গত রবিবার (১৪ অক্টোবর) ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়ে ভালসারটান জেনেরিকের কয়েকটি ওষুধের নির্দিষ্ট কিছু ব্যাচের ওষুধ সাত দিনের মধ্যে বাজার থেকে প্রত্যাহার করতে বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল, পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস, ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, রেনাটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ও দি একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের নাম রয়েছে। চিঠিতে কেবল চীনের ঝিজিয়ান ফার্মাসিউটিক্যালস ও ঝুহাই রানডু ফার্মাসিউটিক্যালস থেকে আমদানীকৃত কাঁচামালে তৈরি কিছু ব্যাচের ওষুধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. রুহুল আমিন স্বাক্ষরিত ওই চিঠির মাধ্যমে অধিদপ্তরের সারা দেশের কর্মকর্তাদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তাঁরা নিজেদের আওতাধীন এলাকায় নির্দেশটি কার্যকর করেন। বলা হয়েছে, এলাকার সব ফার্মেসিতে গিয়ে নির্দিষ্ট ওষুধ খুঁজে পেলে তা সিলগালা করে রেখে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

মো. রুহুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ঝুঁকির আশঙ্কার কথা দেখে আমরা অধিকতর সতর্কতা হিসেবে ব্যবস্থা নিয়েছি। ভালসারটান ও অ্যামলোডিপিন ওষুধ বিশ্বব্যাপী খুবই কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও আমরা এ পদক্ষেপ নিয়েছি। তবে এ নিষেধাজ্ঞা কেবল নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমদানীকৃত কাঁচামালে তৈরি নির্দিষ্ট কিছু ব্যাচের ওষুধের ক্ষেত্রে; তার মানে হচ্ছে এই আইটেমের সব ওষুধ কিন্তু নিষিদ্ধ করা হয়নি। তার পরও কারো কোনো সন্দেহ তৈরি হলে ডাক্তারের পরামর্শে প্রয়োজনে ওষুধ বদল করার সুযোগ তো আছেই। আমাদের দেশেই একই ধরনের বহু ওষুধ রয়েছে।’

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফুড অ্যান্ড ড্রাগস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) প্রতিবেদনে ভালসারটান ওষুধ তৈরিতে কিছু কাঁচামাল ব্যবহারের কারণে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকার তথ্য প্রকাশ করে। এরপরই ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে এটি নিষিদ্ধ করা হয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাও ওই নিষেধাজ্ঞায় সম্মতি দেয়। ভালসারটানের ওই উপাদানে লিভার, ফুসফুস ও স্তন ক্যান্সারের প্রভাব বেশি থাকে বলেও ওই প্রতিবেদনে বলা হয়।

জানতে চাইলে ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম-বিপণন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের নির্দেশ পাওয়ার পরপরই আমরা নির্দিষ্ট আইটেমের ওষুধ বাজার থেকে তুলে নিয়ে ধ্বংস করে ফেলেছি।’

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক বলেন, ‘যে প্রতিবেদনের আলোকে আমাদের সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেই প্রতিবেদনেই বলা আছে কোনো ভালসারটান আইটেম সেবনকারী কোনো রোগী ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজেরাই যেন ওষুধ পরিবর্তন না করেন। বরং ডোজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত যেন তা চালিয়ে যান।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রস্তুতি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুকও ভালসারটান সেবনকারীদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার স্ত্রীও এখনো ভালসারটান সেবন করছে, আমি নিজেই কিনে আনছি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ভালো ও বিশ্বস্ত কম্পানির ওষুধ হলে খুব একটা চিন্তার দরকার পড়ে না। কারণ যারা ভালো কম্পানি তারা সরকারের নিষেধাজ্ঞা ও আমদানির ক্ষেত্রে সচেতন আছে; পরীক্ষা-নিরীক্ষার মানও তারা বজায় রাখে নিজেদের গুডউইল ও ব্যবসার খাতিরেই। আর সরকার ভালসারটানের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট যে ব্যাচ খুঁজে বের করে নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা করেছে তা ইতিবাচকই হয়েছে।’

 

 



মন্তব্য