kalerkantho


মালদ্বীপে চীনপন্থী প্রেসিডেন্টের পরাজয়

কৌশলগত লড়াইয়ে ফিরল ভারত

আমাদের প্রকৃতিগত মিত্র ভারত, চীনা সব প্রকল্প খতিয়ে দেখা হবে : মোহাম্মদ নাশিদ

মেহেদী হাসান   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



চীনপন্থী প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মালদ্বীপে কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় ফিরেছে ভারত। ‘ভারতপন্থী’ নির্বাসিত সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের দল মালদিভয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টির (এমডিপি) বিজয় দাবি, প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনের পরাজয় মেনে নেওয়া নিয়ে শঙ্কা আর আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণায় মালদ্বীপের নির্বাচন কমিশনের দেরির মধ্যেই গত সোমবার বিশ্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে ভারতই প্রথম এক বিবৃতিতে ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহকে অভিনন্দন জানায় এবং আশা প্রকাশ করে, নির্বাচন কমিশন দ্রুতই আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল নিশ্চিত করবে।

বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় অবস্থানরত সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে আবদুল্লাহ ইয়ামিনের বিরুদ্ধে এমডিপির ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহকেই প্রার্থী করা হয়। শেষ পর্যন্ত আবদুল্লাহ ইয়ামিনকে হারিয়ে ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহই আগামী ১৭ নভেম্বর মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

এ বছরের শুরুর দিকেও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর পর্যবেক্ষণ ছিল, মালদ্বীপে চীনা প্রভাবের কাছে হারতে বসেছে ভারত। গত ফেব্রুয়ারিতে মালদ্বীপে রাজনৈতিক সংকট ও কারাবন্দিদের মুক্ত করতে ভারতের হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদ। অন্যদিকে চীন বলেছিল, তারা মালদ্বীপ সংকটে ভারতের হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনকে ঠেকাতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টার মধ্যে গত ৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফোনালাপেও মালদ্বীপ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। তা ছাড়া তখন কলম্বোয় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত অতুল কেসাপের বাসভবনে মালদ্বীপ পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে সমমনা বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত/প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলেছে, ১৯৮৮ সালে প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুমকে উদ্ধারে ভারত সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারলেও ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভিন্ন এক বাস্তবতায় তা পারেনি। সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গাইয়ুম তখন ভারতের হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিজের নিকারাগুয়া সিদ্ধান্তের আলোকে ভারত মালদ্বীপে ‘অপারেশন ক্যাকটাস’ পরিচালনা করে গাইয়ুমকে উদ্ধার করেছিল। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে ভারতের হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছিলেন নির্বাসিত সাবেক এক প্রেসিডেন্ট। সে অনুযায়ী ভারত উদ্যোগ নিলে তা বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনের বিরুদ্ধে যেত এবং জাতিসংঘ সনদের ধারা ২ ও চ্যাপ্টার ৩ অনুযায়ী বেআইনি হিসেবে গণ্য হতো।

বিজয়ী দল এমডিপির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ এরই মধ্যে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের শাসনামলে চীনের ‘জমি দখলের’ অভিযোগের আলোকে নতুন সরকার সব অবকাঠামো প্রকল্প খতিয়ে দেখবে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশ থেকে কী পরিমাণ টাকা মালদ্বীপে এসেছে, তাও তদন্ত করা হবে। বিশেষ করে মালদ্বীপের ‘ভারতই প্রথম’ নীতিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করবে ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহর সরকার।

দ্য হিন্দুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাশিদ বলেছেন, ‘ভারত আমাদের প্রকৃতিগত অংশীদার। জোটের অবস্থান কী হবে আমি জানি না। তবে আমার অবস্থান আগের মতোই আছে। চীনা প্রকল্পগুলোর কোনোটিই ব্যবসার উদ্দেশ্যে করা হয়নি।’

মালদ্বীপের এই নির্বাচন নিয়ে এশিয়া টাইমস এক বিশ্লেষণে লিখেছে, ‘মালদ্বীপের নির্বাচনে চীন হেরেছে, জিতেছে ভারত। ভারত মহাসাগরীয় প্রজাতন্ত্রটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছিল চীন বনাম ভারত ছায়াযুদ্ধ, যেখানে দিল্লিপন্থী প্রার্থী ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ জয়ী হয়েছেন।’

ইন্ডিয়ান ওয়েব পাবলিকেশনস স্ক্রলডটইনে বিশ্লেষক ওমকার খন্দকার লিখেছেন, ‘ভারতবিরোধী আবদুল্লাহ ইয়ামিনকে ভোটে হারিয়েছে মালদ্বীপ। এখন দিল্লি তা উদ্‌যাপন করতেই পারে।’

টাইমস অব ইন্ডিয়ার কূটনৈতিক সম্পাদক ইন্দ্রানি বাগচি মালদ্বীপ বিষয়ে বেশ কয়েকটি টুইট বার্তায় লিখেছেন, মালদ্বীপে নতুন প্রেসিডেন্ট এলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন অধ্যায় রচিত হবে। এ নির্বাচনে ভারত দৃশ্যত কোনো ফ্যাক্টর ছিল না। প্রতিবেশীদের জন্য এটি সব সময় ভালো। মালদ্বীপের নির্বাচন নিয়ে শক্ত অবস্থান ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ)। তবে নয়াদিল্লি মালদ্বীপের জনগণের পক্ষে সরল অবস্থান নিয়েছিল। এ অঞ্চলে অনেক ক্ষেত্রেই ভারতের ভূমিকা কাজে আসেনি।

ইন্দ্রানি বাগচি মনে করেন, ২০১৫ সালে নেপালের ঘটনাবলির পর ভারত মালদ্বীপে এমন উদ্যোগ নেয়নি যাতে সাধারণ মানুষের ওপর তার প্রভাব পড়ে। এখানে উল্লেখ্য, দৈনন্দিন চাহিদাগুলো মেটাতে মালদ্বীপের জনগণের ভারতকে প্রয়োজন। তিনি লিখেছেন, ইয়ামিনের শক্তির খেলার নেপথ্যে ছিল ঔদ্ধত্য ও লোভ। তাঁর মূল সমর্থক ছিল চীন ও সৌদি আরব। তিনি ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। মালদ্বীপের নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখবে। আবার একই সঙ্গে চীনের সঙ্গেও নিবিড় সম্পর্ক অব্যাহত রাখবে। অন্তত চীনা ঋণ এবং অবকাঠামোর জন্য মালদ্বীপকে তা করতে হবে। ভারত এ ক্ষেত্রে এখনো যথেষ্ট সমর্থ নয়। তাই চীন কৌশলগত লড়াই থেকে দূরে চলে যাচ্ছে না। বরং ভারত এ লড়াইয়ে আবার ফিরছে।



মন্তব্য