kalerkantho


গোয়ালন্দে নদীভাঙন, আহাজারি আর রক্ষার আকুতি

সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে যমুনা নদীর পানি বাড়ছে

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পদ্মার ভয়াবহ তাণ্ডব চলছে। সেখানে প্রবল স্রোতে ভাঙনের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে। ভাঙনের কবলে পড়ে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে পদ্মাপারের দৌলতদিয়া, দেবগ্রাম ও ছোট ভাকলা ইউনিয়ন এলাকার ফসলি জমিসহ কয়েক শ মানুষের ঘরবাড়ি। ভাঙন হুমকির মুখোমুখি হয়ে পড়ায় অনেকেই তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে, গাছপালা কেটে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে। এলাকাবাসীর অনেকে বলেছে, তারা ত্রাণ চায় না। নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেতে চায়। এদিকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুরে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ফেরিঘাট থেকে পদ্মা নদীর তিন কিলোমিটার উজানে অবস্থিত উপজেলার ঢল্লাপাড়া গ্রাম। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ওই গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, সেখানে ভয়াবহ আকারে নদীভাঙন চলছে। মুহূর্তের মধ্যে নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে ঘরবাড়ি। ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়েছে। ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেতে ওই গ্রামের এক বৃদ্ধাকে পদ্মার পারে দাঁড়িয়ে দুহাত তুলে মোনাজাত করতে দেখা যায়। গ্রামের ৭০ বছরের বৃদ্ধা পাখিরুন নেছা এখন পাগলপ্রায়। তিন দিন আগে তাঁর বসতভিটা পদ্মা গ্রাস করেছে। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করে তিনি বলছেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি আমাদের রক্ষা করো।’ এ সময় সেখানে উপস্থিত দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য উজ্জল হোসেন বাবু ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মো. আইয়ুব আলী খাঁ জানান, গত এক সপ্তাহে ঢল্লাপাড়া গ্রামের শফি বেপারী, সালাম মালত, আজাহার শেখ, ইদ্রিস মালত, জুলমত শেখ, শহিদ মুন্সি, মোজাই মিস্ত্রিসহ শতাধিক পরিবারের বসতভিটা পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন হুমকির মুখোমুখি হয়ে আছে গ্রামের আরো চার শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি।

ঢল্লাপাড়া জামে মসজিদ, কবরস্থানসহ এলাকার ঐতিহ্যবাহী রমজান আলী মুন্সির মাজারটিও যেকোনো সময় পদ্মায় বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঘরবাড়ি হারানো লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফসলি জমিসহ বসতভিটা হারিয়ে তারা এখন সর্বহারা। অনেকে বিভিন্ন এলাকায় আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। আবার উপায় না পেয়ে অনেকে উপজেলা এলাকার বিভিন্ন সড়ক ও রেলপথের ঢালে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে পলিথিন ও পাটখড়ি দিয়ে ছাউনি ঘর বানিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে।

‘আমরা ত্রাণ চাই না। নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেতে চাই’—এ কথা বলেছে অনেকে। দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম মণ্ডল জানান, পদ্মাপারের দৌলতদিয়া, দেবগ্রাম ও ছোট ভাকলা ইউনিয়ন নদীভাঙনের এলাকা। প্রতিবছর সেখানে ভাঙনের কবলে পড়ে শত শত পরিবার গৃহহীন হয়। পাশাপাশি ফসলি জমিজমা হারিয়ে মানুষ হয়ে পড়ে কর্মহীন। তিনি বলেন, ‘ভাঙন রোধে অন্তারমোড় এলাকা থেকে দৌলতদিয়া ইউনিয়নের বাহিরচর গ্রাম পর্যন্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা খুব জরুরি। এতে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট রক্ষাসহ গোয়ালন্দ উপজেলা এলাকার ভাঙন স্থায়ীভাবে রোধ করা সম্ভব হবে।’

গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান মো. আতর আলী সরদার বলেন, ‘গত কয়েক বছরের ভাঙনে আমার ইউনিয়নের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে। এবারও ভাঙনের কবলে পড়ে দেবগ্রাম ইউনিয়ন এলাকার ফসলি জমিসহ বিভিন্ন গ্রামের কয়েক শ মানুষের ঘরবাড়ি পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে।’ তিনি আরো বলেন ‘জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধ করা না হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মানচিত্র থেকে দেবগ্রাম ইউনিয়ন হারিয়ে যাবে।’

গোয়ালন্দ উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসের কর্মকর্তা মো. ইদ্রিস আলী জানান, পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার) এক সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বিপত্সীমার এক সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীতে প্রচণ্ড ঘূর্ণিস্রোত বয়ে বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে দৌলতদিয়া ও দেবগ্রামে ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি।

কাজিপুরে ২৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি

কালের কণ্ঠ’র কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, পাহাড়ি ঢলে সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুরে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে চরাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় মহিমাপুর, কালিকাপুর, জিওল, দাঁদবোরা, পলাশপুর, কালিকাপুর, মাজনাবাড়ি, হাটগাছা, নতুন মাইজবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও খাসরাজবাড়ি বালিকা বিদ্যালয়সহ মোট ২৫টি বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

কাজিপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন জানান, কিছু বিদ্যালয়ে পানি ঢোকায় পাঠদান বন্ধ হয়েছে। হাটগাছা, খাসরাজবাড়ি, পলাশপুর, নতুন মাইজবাড়ি, মাজনাবাড়ি, দাতবোড়া, খিরাইকান্দি, শুভগাছা, উজান মেওয়া খোলা, নতুন মাইজবাড়ি ও ভাঙ্গারছেও গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে করে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে চরাঞ্চলের মানুষ। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মামুনুর রহমান জানান, এবারের বন্যায় কাজিপুরে প্রায় ২২০ হেক্টর রোপা আমন ক্ষেত পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে।

 



মন্তব্য