kalerkantho


বিচার বিভাগের দুর্নীতি নিয়ে জরিপ

টিআইবিতে অবিশ্বাস অনেকের

আশরাফ-উল-আলম ও রেজাউল করিম   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



টিআইবিতে অবিশ্বাস অনেকের

দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে বিচার বিভাগে দুর্নীতি আবারও বাড়ছে বলে যে চিত্র এসেছে তা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। সংস্থাটির জরিপে ২০১০ সালে বিচার বিভাগ ছিল দুর্নীতির শীর্ষে। ওই জরিপে দেখা যায়, দেশের উচ্চ আদালত থেকে নিম্ন আদালতে বিচারপ্রার্থীদের ৮৮ শতাংশ দুর্নীতির শিকার হয়। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০০৯ সালে দুর্নীতির শিকারের হার ছিল ৪৭ শতাংশ। এক বছরে এই ব্যাপক বৃদ্ধির পর সংস্থাটির জরিপে দেখা যায়, ২০১০ সালের পর থেকে বিচার বিভাগে দুর্নীতির পরিমাণ কমে আসে। ২০১৫ সালে দুর্নীতির শিকার হয় ৪৮.২ শতাংশ। গত ৩০ আগস্ট প্রকাশ করা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৭ সালে আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৬০.৫ শতাংশে। দুই বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১২ শতাংশ।

কয়েক বছর ধরে বিচার বিভাগে দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য সুপ্রিম কোর্টসহ আইন মন্ত্রণালয় ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তা সত্ত্বেও দুর্নীতির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্টরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। বিচার বিভাগে গিয়ে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি, ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া, অনিয়ম তথা দুর্নীতির শিকার হওয়া নতুন তথ্য নয়। তবে টিআইবির জরিপে দুর্নীতির প্রায় খাড়া ওঠানামার চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সরকারসহ কেউ কেউ। তবে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, সংস্থাটির প্রতিবেদনের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে।

টিআইবির প্রতিবেদন নিয়ে দেশের আইন বিভাগ কখনো গবেষণা করেনি। যদি সংস্থাটির প্রতিবেদন সত্য হয় তাহলে করণীয় কী হবে তার নীতিমালাও হয়নি। ২০১০ সালে টিআইবি দেশের দুর্নীতিতে বিচার বিভাগকে শীর্ষে রাখার পর সুপ্রিম কোর্ট সংস্থাটিকে ডেকেছিলেন। এর পরের বছর থেকে টিআইবির প্রতিবেদনে বিচার বিভাগের দুর্নীতি কমে আসার চিত্র দেখা যায়। এ বছর দেওয়া প্রতিবেদনে তা আবার বেড়েছে। এই বাড়ার পেছনে কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না সেই প্রশ্নও তুলেছে সরকার।

আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক টিআইবির প্রতিবেদন ভিত্তিহীন দাবি করেছেন। বিচার বিভাগ নিয়ে টিআইবি যাতে এ রকম ভিত্তিহীন প্রতিবেদন করার সুযোগ না পায় তার জন্যও কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেছেন, ‘টিআইবির প্রতিবেদন পাওয়ার পর আমিও বিচার বিভাগের ওপর বিশেষভাবে নজর রাখছি। কাজও করছি। যাতে করে টিআইবির এই প্রতিবেদন অসত্য প্রমাণিত করতে পারি।’ আইনমন্ত্রী বলেন, ‘টিআইবি যে প্রতিবেদন করেছে এটিকে আমি বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। এটি যে একটি উদ্দেশ্যমূলক প্রতিবেদন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। টিআইবি কোনো বিশেষ স্বার্থ হাসিলের জন্যই যে এই প্রতিবেদন করেছে, এটি বোঝার অপেক্ষা রাখে না।’ তিরি আরো বলেন, টিআইবি দুর্নীতি নিয়ে কাজ করে। তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে দুর্নীতির হার কম দেখালে দুর্নীতি নিয়ে তাদের কাজের ক্ষেত্র কমে আসবে। ফলে উদ্দেশ্যমূলকভাবেই  প্রতিবেদন করে তারা।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুল বাসেত মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, সেবাখাতের দুর্নীতিতে বিচার বিভাগের অবস্থান নিয়ে টিআইবি যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের প্রতিবেদন নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন রয়েছে। এখন বিচার বিভাগে দুর্নীতির পরিমাণ একেবারেই কম। বর্তমান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন যে ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন, তা বাস্তবায়ন হলে বিচার বিভাগের দুর্নীতি একবারেই নির্মূল হবে। তবে নিম্ন আদালতে কিছু অনিয়মের অভিযোগ আছে।

এই আইনজ্ঞের মতে, আদালতে দুর্নীতির মূল কারণ হলো মামলার বিচারে দীর্ঘসূত্রতা। দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা গেলে দুর্নীতি একেবারেই নির্মূল সম্ভব। এজন্য দক্ষ বিচারক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে উচ্চ আদালতে আরো বেশি সংখ্যায় দক্ষ বিচারক নিয়োগের উদ্যোগ নিতে হবে। বিচারিক সেবাখাতের দুর্নীতির সঙ্গে আইন মন্ত্রণালয়ের কোনো সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগে আইন মন্ত্রণালয় শুধু একটি পোস্টবক্সের কাজ করে থাকে। বিচার বিভাগের সার্বিক সিদ্ধান্ত, সব কিছুই সুপ্রিম কোর্টের জিএ কমিটি (জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কমিটি) নিয়ে থাকে।’

তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের বিচার বিভাগে যে আপাদমস্তক দুর্নীতি রয়েছে, এটি অস্বীকার করার কিছু নেই। বিচার বিভাগ নিয়ে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল যেভাবে বক্তব্য দেয় তাতে মনে হয়, এই বিভাগে কোনো দুর্নীতি বা অনিয়ম নেই। কিন্তু বিচারপ্রার্থীরাই ভালো বুঝতে পারে এই অঙ্গনে এখন কতটা জটিলতা বিরাজ করছে। সরকারের অন্য অফিসগুলোতে টাকা ছাড়া যেমন কোনো ফাইল মেলে না, আদালতগুলোতেও প্রায় একই অবস্থা। তিনি বলেন, তবে টিআইবি যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে অবস্থার কিছুটা উন্নতির কথা বলা হয়েছে। এটি আপাতত সুখবর মনে হলেও আসলে সুখবর নয়। বাস্তবতা আরো ভয়াবহ। বিচার বিভাগের কর্তা হিসেবে কাজ করে আইন মন্ত্রণালয়। দুর্নীতির বিষয়ে এই মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা ও বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এই আইনজ্ঞ বলেন, বিচারঙ্গনে দুর্নীতি নিয়ে প্রধান বিচারপতিরা বরাবরই বড় বড় উদ্যোগ নেন। কিন্তু কী কারণে সেই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেন না, তা আর কেউ বলেন না। এমনকি ওই বিচারপতিরা অবসরে গেলেও কিছু বলেন না। বিচার বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে অনেকগুলো কমিটি রয়েছে। এই কমিটিগুলো যদি যথাযথ কাজ করে, তাহলে হয়তো দুর্নীতি কিছুটা কমে আসতে পারে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘আমি মনে করি, উচ্চ আদালত দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্সে রয়েছে। তবে আমাদের টোটাল বিচার বিভাগের মধ্যে নিম্ন আদালতগুলো দুর্নীতির ঊর্ধ্বে ছিল না, এখনো নেই। এ ক্ষেত্রে টিআইবির যে প্রতিবেদন অমূলক এ কথা বলতে পারি না।’ তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগের দায়িত্বে যে মন্ত্রণালয় রয়েছে তার আরো সচেতন হওয়া দরকার। এই মন্ত্রণালয় যে ঘুষ-দুর্নীতির ঊর্ধ্বে তাও আমি বলতে পারব না। তবে আমাদের হাইয়েস্ট কোর্টের বিচারকরা এখনো ঘুষ-দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থেকে বিচারব্যবস্থা পরিচালনা করছেন।’



মন্তব্য