kalerkantho


ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের পায়ের চিকিৎসা মিরপুরে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



কুমিল্লার দাউদকান্দির এরশাদ মিয়া সরকার। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে পায়ে পচন ধরে যায়। কথা বলার শক্তি হারান। চোখেও স্পষ্ট দেখতে পান না। অবস্থা এমন যে দেশের অনেক বিশেষায়িত হাসপাতাল ঘুরেও কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি খোঁজ পান বারডেমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতালের।

এই হাসপাতালের ফুটকেয়ার ইউনিটে ভর্তি হন এরশাদ মিয়া। প্রায় সাত মাস হলো তিনি এই ইউনিটের পর্যবেক্ষণে। এত দিনের চিকিৎসা ও থেরাপিতে তাঁর পায়ের পচন ৯৫ শতাংশই সেরে গেছে। কথা বলতে পারছেন; চোখেও দেখছেন। তিনি বলেন, ‘আমি যে অবস্থায় ছিলাম কেউ বিশ্বাস করেনি যে আমি বাঁচব। তারপর ১৯ দিন পর আমার সেন্স ফিরে এলো। এখানে ট্রিটমেন্ট করার পর দিন দিন সুস্থ হয়ে উঠছি। ডাক্তার বলেছেন, এখন প্রায় ৯৫ ভাগ ঠিক হয়েছে।’ আরেক রোগী নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাঙ্গার সত্তরোর্ধ্ব আফাজ উদ্দিন। চার মাসে ধরে এই ইউনিটে আছেন তিনি। তাঁর পায়ের মাংস খসে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। এখন তিনি বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেক রোগী গত এক বছরে এখানে চিকিৎসা নিয়ে পা বাঁচিয়েছে। আবার অনেকে বিষয়টি জানে না বলে এমন বিশেষায়িত চিকিৎসা নিতে পারছে না।

ডায়াবেটিক রোগীদের পা বাঁচানোর তাগিদে মিরপুর দারুসসালামে অবস্থিত বারডেমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতাল বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ফুটকেয়ার ইউনিট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। এই ইউনিটে জেনারেল সার্জন, নিউরোসার্জন, ভাসকুলার সার্জন, নিউরোমেডিসিন, ফুটিয়েটিক বিশেষজ্ঞ—সব মিলে গঠিত টিম সর্বোচ্চ মানের ডায়াবেটিক ফুটকেয়ার সেবা নিশ্চিত করে বলে জানালেন চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ডায়াবেটিসজনিত পায়ে ঘা বা পচন ধরার একমাত্র বিশেষায়িত চিকিৎসা হয় এই ফুটকেয়ার ইউনিটে। এখানে যাঁরা ফুটকেয়ার সার্জন তাঁদের সার্জারির ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এখানে বিশেষ টেকনোলজির মাধ্যমে রোগীদের সেবা দেওয়া হয়। যেটি বাংলাদেশে এই প্রথম। এখানে সার্বক্ষণিক তদারকিতে যেসব নার্স আছেন, তাঁদেরও বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে শুধু এই ইউনিটের জন্য। এখানে চার সদস্যের কাউন্সেলিং টিম গঠন করা আছে, যাঁরা নিয়মিত রোগীদের মোটিভেশন দেন এবং রোগীদের কোনো অভিযোগ থাকলে টিমের সদস্যরা সরাসরি পরিচালকের কাছে প্রতিবেদন দেন।

ফুটকেয়ার ইউনিটে দায়িত্বরত সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার শাহানা আক্তার বলেন, ‘মূলত ডায়াবেটিক রোগীরা বেশির ভাগ সময় থাকে অবহেলিত এবং হাসপাতালে আসে বেশ দেরিতে। তখন আমাদের জন্য বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। বিলম্বের কারণে অনেক সময় অনেকের পা রক্ষা করতে পারি না। দেখা যায়, সঠিক সময়ে এলে পা-টি আমরা রক্ষা করতে পারি। রোগীদের মধ্যে যদি একটু সচেতনতা বাড়ে এবং পরিবার যদি রোগীকে সাপোর্ট দেয় তাহলে পা কাটা থেকে অনেক রোগী বেঁচে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে বেশির ভাগ রোগী আসে নিম্নবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত। দেখা যায়, পরিবারের উপর্জনক্ষম ব্যক্তিই পায়ে এমন সমস্যা নিয়ে আসেন; তাঁদের জন্য পা-টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের রোগীই বেশি আমাদের। যখন প্রথম আসেন তখন সবারই একটিই কথা—পা-টি যে করে হোক বাঁচাতে হবে। ভালো লাগে যখন দেখি, যারা চিকিৎসা নিয়ে ফিরে যায় তারা হাসিমুখেই ফিরছে। তবে এখানে অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জের বিষয় হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা। অনেক রোগীর পাঁচ-সাত মাসও থাকা লাগে। কারণ ড্রেসিংয়ের একটা ব্যাপার থাকে।’

বিআইএইচএস হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) প্রফেসর ডা. মো. আব্দুল মজিদ ভুঁইয়া জানান, ফুটকেয়ার ইউনিটের স্বপ্নদ্রষ্টা প্রফেসর এ কে আজাদ খান। তিনিই এই ইউনিট করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এখানে মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট থেকে শুরু করে সার্জিক্যাল ট্রিটমেন্ট অপারেশন সবই হয়।’

ডা. মো. আব্দুল মজিদ বলেন, ‘এই ইউনিট শুধু পুরুষদের জন্য। কারণ পায়ে এমন সমস্যা আক্রান্তদের ৮৫ শতাংশই পুরুষ আর ১৫ শতাংশ নারী। খুব শিগগির নারীদের জন্যও আলাদা ইউনিট করার পরিকল্পনা আছে। তবে অনেক সময় আমরা রোগীদের জায়গা দিতে পারি না। কিন্তু তখন আমরা অন্য ইউনিটে তাদের রেখে চিকিৎসা দিই; যেমনটা করি নারী রোগীরা এলে। বেড সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও আছে। এখন বেড আছে ২২টি। কেবিন চারটি।’



মন্তব্য