kalerkantho


ঢাকায় বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছেই

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ঢাকায় বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছেই

রাজধানীতে নির্ধারিত স্থানে বাস থামার কথা থাকলেও আগের মতোই যেখানে-সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা চলছে। ছবিটি গতকাল বিকেলে বিমানবন্দর সড়কের কাকলী থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর আগারগাঁও মোড়ে আটটি লেনের মোহনায় গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় ট্রাফিক পুলিশ আর পথচারীদের ফাঁক দিয়ে ছুটছিল মিরপুরমুখী বাসগুলো। ওখানে রাস্তা পারাপারের কোনো ব্যবস্থাই নেই। মোড়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল অনেক শিশু, নারী ও পুরুষ। কিন্তু যে কয়েকটি বাস চোখে পড়ে তার কোনোটির দরজা বন্ধ, কোনোটিতে দরজার পাদানিতেও ঝুলছিল যাত্রীরা। সদরঘাট থেকে মিরপুরগামী বিহঙ্গ পরিবহনের যাত্রীতে ঠাসা একটি বাস (ঢাকা মেট্রো ব-১৪-২০৮৬) ছুটছিল একটি ব্যক্তিগত গাড়ির (ঢাকা মেট্রো গ-২৩-১৪৯০) সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। ফাঁক পেয়ে ওই সব যানবাহনের সামনে দিয়েই দৌড়ে রাস্তা পার হন জাহাঙ্গীর হোসেন। এতটা ঝুঁকি কেন নিলেন জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘১০ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকেও দেখছি শুধু গাড়ি চলছেই। পাসপোর্ট অফিসের দিকে একটা জরুরি কাজে দ্রুত যেতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেওয়া ১৭টি নির্দেশনার একটি হলো, ঢাকায় বাস ও মিনিবাস চলাচলের সময় দরজা বন্ধ রাখতে হবে। গত মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে জরুরি বৈঠকেও পরিবহন নেতারা হাইড্রোলিক দরজা লাগানোর প্রস্তাব রাখেন। কিন্তু গতকাল নগরীর বেশির ভাগ বাসের দরজা বন্ধ রাখতে দেখা যায়নি। পথে যেখানে-সেখানে যাত্রী তোলা হয়েছে।

গতকাল নগরের প্রধান সড়কে লেগুনা দেখা গেছে কম। আগারগাঁও ৬০ ফুট রাস্তা থেকে বাংলাদেশ বেতার ভবনের সামনে পর্যন্ত শতাধিক লেগুনা চলাচল করলেও সেগুলো মহাখালী বা গুলশানের দিকে যায়নি। ১৫৯টি রুটে প্রায় পাঁচ হাজার লেগুনার নিয়ন্ত্রিত চলাচলে বাসের ওপর চাপ পড়ে আরো বেশি। বিআরটিসির দোতলা বাসের দরজায় ঝুলে চলতে হয়েছে যাত্রীদের। এমনিতেই রাজধানীতে বাস কম। সম্প্রতি কড়াকড়ির কারণে তা আরো কমে গেছে। এ অবস্থায় প্রধান সড়কে লেগুনা চলতে না দেওয়ায় সাধারণ মানুষের কষ্ট বেড়েছে। লেগুনা চলাচল করেছে বিভিন্ন সংযোগ সড়কে। এ কারণে লেগুনার নিয়মিত যাত্রীদের বাসে ওঠার জন্য অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে। নিরুপায় হয়ে অনেককে বেশি ভাড়ায় চলতে হয়েছে অটোরিকশায় কিংবা উবার-পাঠাওয়ের গাড়িতে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) গত মঙ্গলবার নগরীতে ১২১টি বাস স্টপেজ নির্ধারণ করে দিয়েছে। তবে বাস্তবে বাস থামানো হচ্ছে যেখানে-সেখানে। বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাসের চালক মো. বাবুল মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাবলিকগো ঠেলায় বাসের গেট বন্ধ করন যায় না। জ্যামে বাসের চাক্কা বন্ধ থাকলেও উইট্টা পড়ে।’ আগারগাঁওয়ে একই বাসে উঠতে গিয়ে পিছলে পড়ে যাচ্ছিলেন মো. আসাদ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘বাস নাই, অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া আছি। বাসায় তো যাইতে হবে, তাই যুদ্ধ করতে হইতাছে।’

প্রায় দুই কোটি মানুষের ঢাকায় স্বাভাবিক সময়ে চলাচল করে প্রায় আট হাজার বাস। তবে পুলিশ ও বিআরটিএর অভিযানের ভয়ে বাস মালিক ও চালকদের একটি বড় অংশই রাস্তায় বাস নামাচ্ছে না। কারণ হয় বাসের ফিটনেস সনদ নেই কিংবা চালকদের বৈধ লাইসেন্স নেই। বিআরটিএর মিরপুর ও ইকুরিয়া কার্যালয়ে ছুটির দিনেও সেবা দেওয়া হচ্ছে। দুই কার্যালয়ে ফিটনেস সনদ দেওয়া হচ্ছে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি। মিরপুর কার্যালয়ে গড়ে ৪২ সেকেন্ডে একটি ফিটনেস সনদ দেওয়া হচ্ছে। অথচ নির্দেশনা মেনে সনদ দিতে কমপক্ষে এক ঘণ্টা লাগার কথা। প্রতিযোগিতা করে সেবা নিতে অনেককে গোপনে ঘুষ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

গত কয়েক দিন মিরপুরে বিআরটিএ কার্যালয়ে গিয়ে ফিটনেস সেন্টার ছাড়াও ডিজিটাল নাম্বার প্লেট, লাইসেন্স শাখার সামনে সকাল থেকেই ভিড় দেখা গেছে। ১ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত ২০ দিনে ওই কার্যালয় থেকে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার যানবাহনের ফিটনেস সনদ দেওয়া হয়েছে।

গত ২৯ জুলাই কুর্মিটোলায় বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থীর প্রাণহানির কারণে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর থেকে বিআরটিএর কার্যালয়ে সেবা দেওয়া হচ্ছে ছুটির দিনেও। পরিবহন মালিক সমিতি ও বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা গেছে, ফিটনেস সনদ নেওয়ার হিড়িক পড়লেও ঢাকার রাস্তায় আগের মতো বাস নামছে না। কারণ জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল কালাম বলেন, দূরপাল্লার বাসসহ নগর পরিবহনের বাসচালকদের একটি অংশের কাছে হালকা গাড়ি চালানোর লাইসেন্স আছে। বিআরটিএর কাছে বারবার শর্ত শিথিল করে পরীক্ষা নিয়ে এসব চালককে ভারী গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু এ সমস্যার সমাধান হয়নি। তার জের ধরে এখন বাস থাকলেও অভিযানের ভয়ে চালকরা বের হচ্ছে না রাস্তায়।

বিআরটিএর পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, গত জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় নিবন্ধিত বিভিন্ন ধরনের গাড়ির সংখ্যা ১১ লাখ ৬০ হাজার ৮৩। এসবের মধ্যে বাস, মিনিবাস ও লেগুনা প্রায় ৪৬ হাজার। ৩৯ হাজার বাস ও মিনিবাসের মধ্যে চলত মাত্র আট হাজার। বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, নিবন্ধিত গণপরিবহনের বিপরীতে পর্যাপ্ত লাইসেন্সধারী চালক নেই। আইন অনুযায়ী এ ধরনের গণপরিবহন চালাতে হলে চালকের অবশ্যই পাবলিক সার্ভিস ভেহিক্যাল (পিএসভি) সনদ লাগে। বিআরটিএ অনুমোদিত পিএসভি লাইসেন্সধারী পরিবহন চালক আছে ১০ হাজার ২৫৬ জন। এ অবস্থায় বিআরটিএর অভিযানে অবৈধ চালকদের জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। ফলে বাস নামানো হচ্ছে কম।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি চুক্তিভিত্তিক বাস চলাচল নিষিদ্ধ করেছে কয়েক সপ্তাহ আগে। তারও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সমিতি তিনটি বাস কম্পানির সদস্য পদ বাতিল করেছে। তবে ওই ঘোষণারও শতভাগ বাস্তবায়ন করা হয়নি। ডিএমপি বলেছে, চালক ও অন্য পরিবহনকর্মীদের বেতনভুক্ত করতে হবে। ঢাকায় প্রায় ২০০ বাস কম্পানির মধ্যে বেশির ভাগ কম্পানির বাসই চলছে চুক্তিতে।

অ্যাসোসিয়েশন অব বাস কম্পানিজ (এবিসি) সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে ২৯৮টি বাস স্টপেজ চিহ্নিত করা হয়েছিল। বিআরটিএ, ডিটিসিবি, ডিসিসি, ডিএমপি এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি স্টপেজগুলোর অনুমোদন দিয়েছিল প্রায় ১৮ বছর আগে। কিন্তু সেসব স্টপেজে বাস থামত না। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের কাছে শাহ আলী প্লাজার সামনে ফার্মগেটমুখী বাসগুলো দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানো হয়। মিরপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কার্যালয়ের সামনে সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে ‘গাড়ি রাখা নিষেধ’। তবে গতকালও সেখানে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মিরপুরমুখী বাসগুলোতে যাত্রী তুলতে দেখা গেছে।

শাহবাগে বারডেম হাসপাতালের সামনে গতকাল বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠাতে ও নামাতে দেখা গেছে। শাহবাগ হয়ে গুলিস্তান ও মতিঝিলগামী বাসের স্টপেজ নির্ধারণ করা হয়েছিল জাতীয় টেনিস কমপ্লেক্সের সামনে। শুধু কাউন্টার সার্ভিসের বাস ওই স্টপেজে থামত। শাহবাগ থেকে ফার্মগেটগামী বাসের স্টপেজ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের কেবিন ব্লকসংলগ্ন ফটকের কাছে। সেখানে কিছু বাস থামতে থামতে মেঘনা পেট্রল পাম্পের সামনে পর্যন্ত গিয়েও যাত্রী তোলে। যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা কিংবা সায়েদাবাদ লেভেলক্রসিংও যেন আস্ত বাস স্টপেজ। বাংলা মোটরের ফেয়ারলি হাউসের সামনের বাস বেতে বাস থামতে দেখা যায় না।

কম্পানিভিত্তিক বাস নেটওয়ার্কের সুপারিশ : পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, কম্পানিভিত্তিক বাস চলাচলের পদ্ধতি প্রবর্তন হলে মালিক ও চালকরা লাভের জন্য এভাবে ছুটবে না।

ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. এস এম সালেহউদ্দিন আহমদ বলেন, ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় এই সুপারিশ করা হয়েছিল ১০ বছর আগে। এটার বাস্তবায়ন হলে অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকত না। বিশৃঙ্খলা কমে যেত।

১০ ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান : বিআরটিএর ১০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত গতকাল ফার্মগেট, মহাখালী, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার্স, আমুলিয়া মডেল টাউন, নবীনগর, ধামরাই, শ্যামলী, কলেজগেট, বিআরটিএ মিরপুর, বিআরটিএ ইকুরিয়া, বিআরটিএ উত্তরা ও চট্টগ্রাম মহানগরে কার্যক্রম চালিয়েছেন। তাতে মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর অধীনে ২৬৯টি মামলায় চার লাখ ৫২ হাজার ১৭০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় একজন চালককে কারাদণ্ড দেওয়া হয়, ১৯টি মোটরযানের কাগজপত্র জব্দ করা হয় এবং ১১টি মোটরযান ডাম্পিং স্টেশনে পাঠানো হয়।

 

 

 



মন্তব্য