kalerkantho


ভয়ংকর হওয়ার ছক ছদ্মবেশী জঙ্গিদের

রেজোয়ান বিশ্বাস   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ভয়ংকর হওয়ার ছক ছদ্মবেশী জঙ্গিদের

দুর্গম চর। নেই কলরব, চারদিক সুনসান। সেখানেই টার্কি মুরগি আর ছাগলের খামার। দিনের আলোতে তাদের এসব খামারেই যত ব্যস্ততা। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে নিজেরাও হয়ে ওঠে ‘ভালো মানুষ’। অনেকে আবার নিরাপদ স্থানে থেকে গ্রাম্য চিকিৎসকেরও কাজ করে। কিন্তু রাতের আঁধারে বেরিয়ে আসে তাদের নিকষকালো রূপ। তারা হাতে তুলে নেয় চাপাতি, বোমা, গ্রেনেড আর আগ্নেয়াস্ত্র। সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মার্শাল আর্টের কসরতও চলে। গ্রাম থেকে শহরে এসে একেকজন হয়ে ওঠে পাকা অভিনেতা। কেউ ভ্রাম্যমাণ বাদাম বিক্রেতা, চা দোকানদার আবার কেউ ফেরিওয়ালা। এভাবেই নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) বর্তমান কর্মকাণ্ড চলছে বলে জানিয়েছে জঙ্গি আবদুর রাজ্জাক। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে তাকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানতে পেরেছে র‌্যাব।

শুধু রাজ্জাকই নয়, সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরা থেকে বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার হওয়া জেএমবি সদস্য মহিবুল ইসলাম, মোজাম্মেল হক ওরফে বিল্লাল, শামীম আহাম্মদ ও দেলোয়ার হোসেন; চাঁপাইনবাবগঞ্জের আকতারুল ইসলাম, আব্দুল কাদের, আমিনুল ইসলাম ও আব্দুর রহমান এবং বরিশালের আব্দুল্লাহ আল মিরাজ ওরফে খালেদ সাইফুল্লাহ জিজ্ঞাসাবাদে প্রায় একই রকম তথ্য দিয়েছে।

উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলে সাকিব নামে একজন জেএমবির নেতৃত্ব দিচ্ছে জানিয়ে এক শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ঢাকার একটি স্বনামধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সাকিবের সঙ্গে আরো বেশ কয়েকজন ছাত্র রয়েছে। তারাও বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র। সাকিব উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলের পদ্মার চরের এই গ্রুপের দলনেতা। সে কখনো নিজেকে রাকিব, সফিক পরিচয় দিয়ে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ায়।

র‌্যাব পুলিশের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে মারা গেলেও তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম থেমে নেই। নতুন করে তারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। কারাগারে থাকা নেতারাও বিশেষ কৌশলে বাইরে থাকা জঙ্গি সদস্যদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে সংগঠনকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। সেই সঙ্গে সারা দেশে বিশেষ কাটআউট পদ্ধতিতে তারা ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ের নেতাদের মাধ্যমে জেএমবি সদস্য বাড়াতে তৎপর রয়েছে। তাদের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের পাশাপাশি উগ্র-মৌলবাদে বিশ্বাসে কিছু ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের গোপন আঁতাত রয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তাদের কর্মকাণ্ড প্রকাশ পেতে পারে। নির্বাচনের আগে ঢাকাসহ জেলা ও উপজেলা শহর এবং গ্রামপর্যায়ে নির্বাচনের মাঠে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে। ধর্মভীরু নারী-পুরুষকে কৌশলে দলে টেনে হামলা নাশকতায় কাজে লাগাতে পারে। সেই সঙ্গে সুযোগমতো রাজনৈতিক সমাবেশেও তারা হামলা চালাতে পারে। এ ধরনের ভয়াবহ আগাম তথ্য পেয়ে এরই মধ্যে গোয়েন্দারা মাঠপর্যায়ে জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছেন। গত কয়েক মাসে সারা দেশে গ্রেপ্তার হওয়া অর্ধশতাধিক জঙ্গি সদস্য গ্রেপ্তার করা করা হলেও এখনো অনেক জঙ্গি সদস্য অধরা রয়ে গেছে।   

পুলিশ ও র‌্যাবের গোয়েন্দা তথ্য মতে, জেএমবিতে এখনো অনেক বোমা তৈরির কারিগর রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া জেএমবি সদস্যদের মধ্যে কেউ বলছে শতাধিক আবার কারো কারো মতে তার চেয়েও বেশি। এর আগে জেএমবির ২০ সদস্য শীর্ষ আল-কায়েদা নেতা মোল্লা ওমরের কাছে বোমার প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। তারা এখন দেশে। বাকিদের মধ্যে ২৫ জন রয়েছে, যারা সম্প্রতি ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া বোমা মিজানের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া। অন্যদের মধ্যে ১০ জন শীর্ষ জঙ্গি নেতা সোহেল মাহফুজের কাছে থেকে। আর ৪০ জন, অন্য জঙ্গি নেতা ওসমান, নাজমুল ও শিবলুর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেয়। এভাবে প্রায় ১০০ প্রশিক্ষিত বোমার কারিগর সম্পর্কে তথ্য পেয়ে তাদের ধরার চেষ্টা করছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া জেএমবি সদস্যদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ সমরাস্ত্র প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল, বোমার ব্যাটারি, গান পাউডার, ডেটোনেটর, চাপাতি, উগ্র জঙ্গিবাদী বই ও ধর্মীয় উসকানিমূলক প্রচারপত্রসহ বিস্ফোরক সরঞ্জাম ও ইলেকট্রিক সার্কিট উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধার হওয়া এসব যুদ্ধ সরঞ্জাম জঙ্গিরা দেশে নাশকতা চালানোর জন্য মজুদ করেছিল বলে র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। তারা র‌্যাবকে আরো জানিয়েছে, তাদের কাছে আরো বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, বোমা সরঞ্জাম মজুদ আছে। 

জঙ্গিবাদের ব্যাপারে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আমরা যত কাজই করি না কেন জঙ্গিবাদ থেকে র‌্যাব কখনো চোখ সরাবে না। জেএমবিসহ নতুন নতুন জঙ্গি সংগঠন যেগুলো আছে সেগুলো নজরদারিতে রাখা হয়েছে। নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।’ সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

র‌্যাবের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, এখনো নানা ছদ্মবেশে জেএমবির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চলছে। জঙ্গিরা মূলত দেশের অখণ্ডতা, সংহতি ও জননিরাপত্তা নষ্ট করতে সমরাস্ত্র প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তারা দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ধর্মভীরু সহজ-সরল ব্যক্তিদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম, নাশকতা সৃষ্টি ও জিহাদে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছে। সারা দেশে তাদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড অনেক বেড়েছে।

জেএমবি বর্তমানে একাধিক গ্রুপে ভাগ হয়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত রয়েছে জানিয়ে এক শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ঢাকাতেও জেএমবি সক্রিয় রয়েছে। তাদের কেউ ফুটপাতে চা বিক্রি করছে। কেউ ভ্রাম্যমাণ বাদাম বিক্রেতা। আবার কেউ বিভিন্ন অফিসের নিরাপত্তারক্ষীর দায়িত্ব পালন করছে। ঢাকার উপকণ্ঠ সাভার ও কেরানীগঞ্জের পাশাপাশি গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে তাদের এখনো অনেক সদস্য রয়েছে। বর্তমানে ঢাকার বাইরে জেএমবির বড় একটি অংশ বাগেরহাটে অবস্থান করছে। সাতক্ষীরা, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশালেও তাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। এসব এলাকায় তারা ছদ্দবেশে অবস্থান করছে। অর্থের জোগান বাড়াতে ডাকাতির সঙ্গেও তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

এনআইয়ের বরাত দিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, জেএমবির কার্যক্রম বাড়ছে। মাঠপর্যায়ে তাদের অনেক সদস্য রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই বোমা বিশেষজ্ঞ।

র‌্যাব-১০-এর পরিচালক অতিরিক্ত ডিআইজি কাইয়ুমুজ্জামান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেএমবি মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন জেএমবি সদস্যকে গ্রেপ্তার করে এ বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তারা দেশের উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলে জঙ্গি প্রশিক্ষণের কথা জানিয়েছে।’



মন্তব্য