kalerkantho


গণহত্যার তথ্য উদ্‌ঘাটন

দুই সাংবাদিকের জেল মিয়ানমারে

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



দুই সাংবাদিকের জেল মিয়ানমারে

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও কিছু গ্রামবাসী রাখাইনের ইনদিন গ্রামে এক দল রোহিঙ্গাকে সারিবদ্ধভাবে বসিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এরপর গণকবর খুঁড়ে তাদের সমাহিত এবং রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে আগুন দেয়। রয়টার্সের  দুই সাংবাদিক ইনদিন গ্রাম ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দা ও নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য ও হত্যাকাণ্ডের ছবি সংগ্রহ করেন। রয়টার্সের দাবি, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার বাহিনীর সাম্প্রতিক হত্যাযজ্ঞের এটিই প্রথম প্রমাণ। মিয়ানমার বাহিনীর গণহত্যার তথ্য উদ্ঘাটনকারী বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এই সাংবাদিকদের গতকাল সোমবার সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ইয়াঙ্গুনের একটি আদালতে। দণ্ডপ্রাপ্ত ওয়া লোন (৩২) এবং কিয়াও সো উ (২৮) দুজনই মিয়ানমারের নাগরিক।

আদালতের বিচারক রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা লঙ্ঘনের দায়ে তাঁদের এ সাজা দেওয়ার কথা বললেও বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, গত ১২ ডিসেম্বর ইয়াঙ্গুনের এক রেস্তোরাঁয় দাওয়াত দিয়ে নিয়ে দুই পুলিশ সদস্য তাঁদের হাতে কিছু মোড়ানো কাগজ ধরিয়ে দেয়। এর পরপরই সেখান থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ওই দুই সাংবাদিককে ধরার জন্যই যে ওই ঘটনা সাজানো হয়েছিল, তা মামলার বিচারের সময় প্রত্যক্ষদর্শী এক পুলিশ সদস্যের সাক্ষ্যে উঠে এসেছিল।

আটক সাংবাদিকদের মুক্তি দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত আহ্বানের মধ্যে ইয়াঙ্গুনের জেলা জজ আদালত গতকাল সকালে তাঁদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ডাদেশ দেন। তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রয়টার্সের প্রধান সম্পাদক স্টিফেন জে অ্যাডলার মিয়ানমার সরকারকে এ রায় সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার, রয়টার্সের সাংবাদিক ওয়া লোন ও কিয়াও সো এবং বিশ্বের সব সংবাদমাধ্যমের জন্য আজ একটি দুঃখের দিন।’

রায়ের পরপরই জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) গভীর হতাশা ব্যক্ত করে দুই সাংবাদিককে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ইয়াঙ্গুনে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস এক বিবৃতিতে বিচার প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। ব্রাসেলসে ইইউর মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেছেন, ১৯২৩ সালের গোপনীয়তা আইনের আওতায় এই রায় মিয়ানমারে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, তথ্য জানার ব্যাপারে জনগণের অধিকার ও আইনের শাসনকে ক্ষুণ্ন করবে।

এশিয়াবিষয়ক ব্রিটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মার্ক ফিল্ড বলেছেন, মিয়ানমারের জন্য খুব খারাপ একটি দিন এসেছে। ইয়াঙ্গুনে ব্রিটিশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা আদালতে পুরো বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, বিচারক সাক্ষ্যকে আমলে নেননি ও ন্যায়বিচার করেননি।

মিয়ানমারে জাতিসংঘের আবাসিক ও মানবিক তৎপরতা সমন্বয়ক নুট ওটসবি বলেছেন, জাতিসংঘ আশা করে ওই দুই সাংবাদিক তাঁদের পরিবারের কাছে ফেরার এবং সাংবাদিক হিসেবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।

কারাদণ্ডাদেশ পাওয়ার পর সাংবাদিক ওয়া লোন বলেন, ‘আমি ভীত নই। আমি কোনো অন্যায় করিনি। আমি ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি।’

ওয়া লোন ও কিয়াও সো উ গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে আটক আছেন। আটক প্রায় দশ মাস তাঁদের সাজার মেয়াদ থেকে বাদ যাবে বলে জানিয়েছেন ইয়াঙ্গুন জেলা জজ আদালতের বিচারক ইয়ে লুইন। তিনি তাঁর রায়ে বলেছেন, ‘ওই দুই ব্যক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ক্ষতি করেছেন।’

বিবিসি সংবাদদাতা নিক বিয়াকে ইয়াঙ্গুন থেকে জানান, অনেকের কাছে এ রায় মিয়ানমারে মুক্ত গণমাধ্যম ও গণতন্ত্রের ওপর আরেকটি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

রয়টার্স বলেছে, রাখাইনের ইনদিন গ্রামে দশ রোহিঙ্গাকে হত্যার বিষয়টি তাদের ওই দুই সাংবাদিকই উদ্ঘাটন করেছিলেন। রয়টার্স আশা করেছিল, ওই দুই সাংবাদিকের তৎপরতা জনস্বার্থ হিসেবেই বিবেচিত হবে। রয়টার্সের প্রধান সম্পাদক স্টিফেন জে অ্যাডলার বলেন, ‘যখন ওয়া লোন ও কিয়াও সো উ আটক হলেন তখন আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁদের নিরাপত্তা। পরে আইনি পরিস্থিতি বুঝতে পেরে দুই সাংবাদিক ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে ইনদিন গ্রামে যা ঘটেছে তা প্রকাশ করা ছিল আমাদের দায়িত্ব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছিলাম। কারণ এটি নিয়ে বিশ্বব্যাপী আগ্রহ ছিল।’

রয়টার্সের ওই প্রতিবেদন প্রকাশের আগে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার বাহিনীর গণহত্যার অভিযোগ উঠলেও মিয়ানমার তা অস্বীকার করে। কিন্তু ওয়া লোন ও কিয়াও সো উর সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ চাপে পড়ে রাখাইনে গণকবর থেকে মরদেহ উদ্ধার ও তদন্ত কমিটি গঠনে বাধ্য হয়।



মন্তব্য