kalerkantho


রংপুরে অভিযানের পরও মহাসড়কে বন্ধ হয়নি তিন চাকার যান

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রংপুরে অভিযানের পরও মহাসড়কে বন্ধ হয়নি তিন চাকার যান

রংপুর নগরের ব্যস্ততম সড়কগুলো যানজটমুক্ত করতে ফোর লেনে রূপান্তর করা হলেও নগরবাসীর দুর্ভোগ কমেনি। বরং অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর অবৈধ অটোরিকশা ও ফুটপাতে হকারদের দখলদারি বেড়েছে। সিটি করপোরেশন থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বৈধ লাইসেন্স দেওয়া হলেও নগরীতে অটোরিকশা চলাচল করছে প্রায় ৪০ হাজার। অর্থাৎ অবৈধভাবে প্রায় ৩৫ হাজার অটোরিকশা চলাচল করছে। আবার অদক্ষ চালকের কারণে দুর্ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত।

মহাসড়কে তিন চাকার ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন অটোরিকশা, রিকশা ও ভটভটি চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও রংপুরে তা মানছে না কেউ। গত কয়েক দিনে চার শ যানবাহন আটক করার পরও এ অনিয়ম ঠেকাতে পারছে না হাইওয়ে পুলিশ। উল্টো চালকরা বলছে—আইন কোনো ব্যাপার না। হাইওয়ে পুলিশকে টাকা দিলেই মহাসড়কে অটোরিকশা, টেম্পো, নসিমন ও ভটভটি বৈধ হয়ে যায়। অবশ্য হাইওয়ে পুলিশের বড় এক কর্মকর্তা বলেন, তিন চাকার যানবাহনের চালকদের এমন মন্তব্যের কোনো ভিত্তি নেই।

রংপুর সিটির ব্যস্ততম মডার্ন মোড়, পার্কের মোড়, কলেজ রোড-লালবাগ, শাপলা চত্বর, গ্রান্ড হোটেল মোড়, জাহাজ কম্পানি মোড়, সুপার মার্কেট ট্রাফিক মোড়, সিটি বাজার, কাচারীবাজার জিরো পয়েন্ট, মেডিক্যাল মোড়, সাতমাথা মোড়, মাহিগঞ্জ ও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল রোডে প্রতিদিনই ভয়াবহ যানজটে পড়তে হচ্ছে নগরবাসীকে। ট্রাফিক পুলিশের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, প্রায় ৩৫ হাজার অবৈধ অটোরিকশার দৌরাত্ম্য আর দখলদারদের কবলে চলাচলের রাস্তাটুকু চলে যাওয়ায় এই ভোগান্তি পিছু ছাড়ছে না। নগরীর প্রধান সড়কগুলোর দুই ধারের ৫৮ ফুট ফোর লেন সড়কের প্রায় পুরোটাই অটোরিকশা আর হকারদের দখলে থেকে যায়। এ কারণে ভয়াবহ যানজট এখন যেন এই নগরীর নিত্যসঙ্গী। অথচ কয়েক বছর আগেও এমন অটোরিকশার যানজট চোখে পড়ত না।

শাপলা চত্বর এলাকার ব্যবসায়ী নূরুল হক, আনোয়ার হোসেন ও তারা মিয়া বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের দায়িত্বহীনতায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অবৈধ অটোরিকশার জন্য আমরা নগরবাসী ভালোভাবে যাতায়াত করতে পারছি না।’ অবৈধ অটোরিকশার দৌরাত্ম্য কমাতে নগরীতে একই রঙের অটোরিকশা চলাচল এবং বাইরে থেকে আসা অটোরিকশা নগরীর নির্দিষ্ট পয়েন্টে গ্যারেজে রাখার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন তাঁরা।

পায়রা চত্বর এলাকার বসির আহম্মেদ, হাদিউল ইসলাম, আবু সাঈদ ও জাকির হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘নগরীর অধিকাংশ অটোচালকই অদক্ষ, অযোগ্য ও অপরিণত বয়সের। তাদের কারণেই যানজট আর প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনা ঘটছে। নিবন্ধনহীন অটোরিকশার দৌরাত্ম্যের জন্য সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতা দায়ী।’

রংপুর সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ নজরুল ইসলাম বলেন, রংপুরে অটোরিকশার লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রয়েছে। তার পরও প্রায় প্রতিদিনই নগরে নতুন নতুন অটোরিকশা আসছে।

এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে প্রায় পাঁচ হাজার অটোরিকশার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে যেসব অটোরিকশা নগরে রাস্তায় চলছে সেগুলোর বিরুদ্ধে পুলিশ সহায়তা করলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুর রহমান সাইফ বলেন, নগরে চলাচল করা অবৈধ অটোরিকশার দৌরাত্ম্য ইতিমধ্যে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। নগরীর যানজট কমাতেও পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

সারা দেশের সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সমপ্রতি সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের সভায় মহাসড়কে ভটভটি, নসিমন, করিমন, অটোরিকশা, টেম্পো, ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়। সভা শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন চলাচল বন্ধে কঠোর নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনা পেয়ে মঙ্গলবার থেকেই মহাসড়কে অভিযানে নামে হাইওয়ে পুলিশ রংপুর সার্কেলের সাত থানা ও ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা। পঞ্চগড়ের বোদা হাইওয়ে ফাঁড়ি, তেঁতুলিয়া হাইওয়ে থানা, দিনাজপুরের দশমাইল হাইওয়ে ফাঁড়ি, রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বড়দরগাহ হাইওয়ে ফাঁড়ি, তারাগঞ্জ হাইওয়ে থানা, লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা হাইওয়ে ফাঁড়ির পুলিশ নিজ নিজ এলাকায় মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন ধরপাকড় শুরু করে।

তারাগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি আবদুল্লাহ হেল বাকি জানান, তিন দিনে ১১০টি অটোরিকশা, নসিমন ও ভটভটি আটক করা হলেও চলাচল বন্ধ হচ্ছে না। মিঠাপুকুর উপজেলার দমদমা এলাকায় ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের অটোরিকশাচালক হায়দার আলী বলেন, ‘পুলিশের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে দৈনিক ১০০ টাকা দিয়া অটো চালাইতেছি।’ তারাগঞ্জ উপজেলা সদরে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে অটোরিকশাচালক তছলিম উদ্দিন বলেন, ‘৫০ টাকা পুলিশকে দিয়া অটো চালান নাগে। টাকা না দিলে অটো ধরে ৫০০-১০০০ টাকা জরিমানা করে।’ আর কাউনিয়া উপজেলার কল্যাণী বাজারের ডিজেলচালিত টেম্পোচালক শওকত আলী বলেন, ‘পুলিশকে দৈনিক ১০০ টাকা দিয়া রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়কে টেম্পো চালাই। পুলিশ কোনো ঝামেলা করে না।’

তবে এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন হাইওয়ে পুলিশ রংপুর সার্কেলের পুলিশ সুপার ধীরেন্দ্র চন্দ্র মহাপাত্র। তিনি বলেন, ‘হাইওয়ে পুলিশ সদস্যরা প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নিজ নিজ এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে মহাসড়কে দায়িত্ব পালন করছে। আমি নিজেও বিভিন্ন জেলায় টহল দিচ্ছি। সমস্যা হলো, যেখানে  চেকপোস্ট বসানো হয় চালকরা সেখান দিয়ে খুব একটা চলাচল করে না। তারা বাইপাস বা সংযুক্ত সড়ক দিয়ে মহাসড়কে চলে আসে। তবে টহল দিয়ে সেসব যানবাহন আটক করা হচ্ছে।’

 



মন্তব্য