kalerkantho


প্রভাষক আছেমের আদম কারবার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



প্রভাষক আছেমের আদম কারবার

মোহাম্মদ আছেম (৩৫)। রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের প্রভাষক। এ শিক্ষকতার আড়ালেই তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন ‘আদম কারবার’। অবৈধ উপায়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে মানবপাচারকারী একটি বড় চক্রের গডফাদার তিনি। মানবপাচারের এ হোতাকে গ্রেপ্তারের দাবি করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন দল। গত ১৪ আগস্ট আছেমকে প্রথম দফায় গ্রেপ্তার করে সিআইডি। একদিন পরই জামিনে মুক্তি পেয়ে যান তিনি। এরই মধ্যে বিশাল নেটওয়ার্কের তথ্য পেয়ে সিআইডি গত রবিবার আছেমকে ফের গ্রেপ্তার করে।

সিআইডি কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষকতা পেশার আড়ালে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে নৌকায় করে পাচার এবং জিম্মি করে পণ আদায়কারী দলের ‘অধিনায়ক’ এই আছেম। তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা আছে। শত শত মানুষ এই চক্রের ফাঁদে পড়ে অনেক টাকা খুইয়েছে। এ চক্রের বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে সদস্য আছে। আছেমের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে শত শত কোটি টাকার লেনদেন দেখা গেছে। তাঁর নিজ নামে, ছোট ভাই জাভেদ মোস্তফা, মা খাদিজা বেগম ও অন্যান্য সহযোগী আরিফ, একরাম, ওসমান সারোয়ারের নামে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে মানবপাচারের টাকা গ্রহণ করেছেন। পরে এসিএম করপোরেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানও খোলেন তিনি। আছেমকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে অনেক বাংলাদেশি পাচার ও জিম্মিদের ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যাবে বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল সোমবার সকালে সিআইডি কার্যালয়ে সংঘবদ্ধ অপরাধ দলের প্রধান, বিশেষ সুপার (এস এস) মোল্যা নজরুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযানের ব্যাপারে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, মোহাম্মদ আছেম একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ‘গডফাদার’। আছেম ও তাঁর সহযোগীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে শতকোটি টাকা লেনদেন পাওয়া গেছে। এই চক্র কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছে। গোটা দেশেই এই চক্রের সদস্যরা সক্রিয় থাকতে পারে। তিনি আরো বলেন, আছেমকে প্রথম দফায় ১৪ আগস্ট গ্রেপ্তার করে সিআইডি। তিন দিন পরই বিজ্ঞ আদালত তাঁকে জামিনে মুক্তি দেন। পরে ১৯ আগস্ট ফের কারওয়ান বাজার থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। মোল্যা নজরুল বলেন, ‘আছেম ২০১০ সাল থেকে চক্রের সঙ্গে জড়িত। তাঁর বাবা ও বড় ভাই দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়া রয়েছেন। এই সুবাদে তিনি মানবপাচারের সঙ্গে জড়িয়ে যান। কক্সবাজার ও টেকনাফ দিয়ে সাগরপথে অবৈধভাবে শত শত মানুষকে তাঁরা মালয়েশিয়া পাঠিয়েছেন। মালয়েশিয়া পাঠানোর পর বিভিন্ন ব্যক্তিকে তাঁরা আটকে রেখে নির্যাতন এবং বাংলাদেশে থাকা তাদের আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে পণ আদায় করতেন। আছেম মুক্তিপণের টাকা তাঁর আত্মীয়-স্বজন, মা ও নিজের অ্যাকাউন্টে জমা রেখেছেন এমন তথ্য আমরা পেয়েছি।’

নজরুল জানান, ২০১৬ সালের ১১ মার্চ আবদুস সালাম সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করেন। তিনি মামলার এজাহারে অভিযোগ করেন, ২০১৪ সালে একটি চক্র তাঁর ছেলে মাসুদকে মালয়েশিয়ায় পাচার করে। পরে তারা ফোনে তিন লাখ ১০ হাজার টাকা পণ দাবি করে। না হলে মাসুদকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়। আবদুস সালাম মহাখালীতে ইসলামী ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে ওই টাকা পরিশোধ করেন। সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন বিভাগ মামলাটির তদন্ত শুরু করে। অ্যাকাউন্টের সূত্র ধরে তদন্ত করে সিআইডি দেখতে পায়, মুক্তিপণ আদায়কারী চক্রটি শত শত মানুষকে এভাবে পাচার করেছে। চক্রটির প্রধান আছেম।

গত বছরের ২ মে মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক আব্দুর রাজ্জাক খান বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। এরপর তদন্ত করে পুলিশ মানবপাচার চক্রের সব সদস্যের পরিচয় জানতে পারে।

জিজ্ঞাসাবাদে সিআইডি থাইল্যান্ডের কারাগারে কমপক্ষে ২০ জনকে আটক থাকার কথা জানতে পারে। সিআইডির বিশেষ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম জানান, আছেম রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারে থাকেন। তিনি তেজগাঁও কলেজের প্রভাষক। তাঁর গ্রামের বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফের মৌলভীপাড়ায়। তাঁর বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, রাজধানীর বনানী এবং বাজিতপুর থানায় মানবপাচার আইনে তিনটি মামলা করা হয়েছে।

 



মন্তব্য